ইসলামের ইতিহাসে হিজরত কেবল একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না; বরং তা ছিল ইমান ও সত্য রক্ষার্থে চরম ত্যাগের এক অনন্য অধ্যায়। সেই ত্যাগের ফলেই ইসলামের দাওয়াত নতুন রূপ পায় এবং মুসলিম উম্মাহ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ও কালজয়ী সভ্যতায় রূপান্তরিত হয়। তবে শারীরিক হিজরতের নির্দিষ্ট সময় ও ফজিলত অতীত ইতিহাসে পূর্ণতা পেলেও, হিজরতের আত্মিক দরজা কেয়ামত পর্যন্ত খোলা রয়েছে। একজন মুমিনের জন্য হিজরত হলো প্রতিনিয়ত নিজের আত্মাকে পাপ থেকে পুণ্যের দিকে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে মহান রহমানের আনুগত্যের দিকে ধাবিত করার এক অনবদ্য আত্মিক সফর।
ইসলামী পরিভাষায় হিজরত প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত। প্রথমটি হলো শারীরিক হিজরত, যা নবুয়তের যুগে ইমান ও জীবন রক্ষার জন্য সাহাবিদের হাবশায় ও মদিনায় স্থানান্তর, মক্কা বিজয়ের আগে মক্কাবাসীদের মদিনামুখী সফর এবং পরবর্তী যুগে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন বা নিরাপত্তার প্রয়োজনে দেশান্তরিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা দেন, ‘মক্কা বিজয়ের পর আর কোনো হিজরত নেই; তবে জিহাদ ও সৎকাজের নিয়ত অবশিষ্ট আছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৮৩) এর মাধ্যমে শারীরিক হিজরতের বিশেষ বাধ্যবাধকতা সমাপ্ত হয়। দ্বিতীয় ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো আমলি বা আত্মিক হিজরত, যা বাহ্যিক হিজরতের বিধান শেষ হওয়ার পরও অব্যাহত থাকে। মহানবী (সা.) এই হিজরতের সারমর্ম ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘প্রকৃত মুহাজির তো সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)
বর্তমান যুগে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্বায়নের কারণে নৈতিক অবক্ষয়, পাপের নানাবিধ সুযোগ ও আত্মিক উদাসীনতা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘রহমানের আনুগত্যে হিজরত’ করার প্রয়োজনীয়তা অন্যান্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। দৈনন্দিন জীবনে এই আত্মিক হিজরতের রূপায়ণ বিভিন্নভাবে ঘটতে পারে। যেমন—শিরক থেকে তাওহিদের দিকে হিজরত, যেখানে কৃত্রিম ভরসা ও বস্তুপূজা ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করা হয়। বিদআত থেকে সুন্নাহর দিকে হিজরত, যেখানে মনগড়া প্রথা ও কুসংস্কার ছেড়ে নবীজির সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা হয়। পাপ থেকে আনুগত্যের দিকে হিজরত, যেখানে চোখ, কান, জবান ও হাতের অবাধ পাপ ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা হয়। উদাসীনতা থেকে জিকিরের দিকে হিজরত, যেখানে পার্থিব বস্তুমোহ ও গাফলতি থেকে বের হয়ে রবের সার্বক্ষণিক স্মরণে মনকে সজীব রাখা হয়। কুসঙ্গ থেকে সৎসঙ্গের দিকে হিজরত, যেখানে পাপের দিকে টানে এমন পরিবেশ বা বন্ধু ত্যাগ করে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এমন মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়া হয়।
হৃদয়কে পাপাচারের অন্ধকার থেকে রহমানের আনুগত্যের আলোয় নিয়ে আসার এই সফর শুরু করার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। প্রথম ধাপ হলো সত্যিকার তওবা ও অনুশোচনা—অতীতের ভুলের জন্য লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করা। দ্বিতীয় ধাপ হলো ঐশ্বরিক সাহায্য প্রার্থনা, কারণ মানুষ নিজের শক্তিতে সবসময় প্রবৃত্তি জয় করতে পারে না; তাই প্রতিদিন দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সঠিক পথ চাওয়া জরুরি। তৃতীয় ধাপ হলো ধারাবাহিক আত্মসংগ্রাম বা মুজাহাদা—পাপের ইচ্ছা জাগলে সাময়িক কষ্ট সহ্য করে তা থেকে বিরত থাকা এবং সৎকাজে মনকে অভ্যস্ত করা। চতুর্থ ধাপ হলো ব্যর্থতায় হতাশ না হওয়া—কোনো ভুল ঘটে গেলে সাথে সাথে তওবা করে পুনরায় আনুগত্যের হিজরতে ফিরে আসা।
যে ব্যক্তি নিজের নফস ও শয়তানের প্ররোচনাকে পেছনে ফেলে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে হিজরত করে, সে জীবনে অসংখ্য আত্মিক নেয়ামত লাভ করে। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি, অন্তরের স্থায়িত্ব ও মানসিক প্রশান্তি, অন্যায় ও পাপ মোচন, এবং ইমানের দৃঢ়তা ও আত্মিক শক্তি। সাহাবি আবু ফাতিমা (রা.) একবার নবীজির কাছে আরজ করেছিলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি কাজের উপদেশ দিন, যার ওপর আমি শক্তভাবে কায়েম থাকতে পারি।’ জবাবে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, ‘তুমি হিজরতকে আঁকড়ে ধরো; কারণ এর সমকক্ষ আর কোনো আমল নেই।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৪১৬৮) এই নির্দেশের মাধ্যমে তিনি মূলত আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন তা থেকে আমৃত্যু দূরে থাকার আত্মিক হিজরতের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। আধুনিক পৃথিবীতে হয়তো আমাদের ভৌগোলিকভাবে হিজরত করার সুযোগ নেই, কিন্তু প্রতিদিনের পাপ, গাফলতি, অন্যায় ও কুপ্রবৃত্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে রহমানের সুশীতল আনুগত্যের দিকে হিজরত করার সুযোগ আমাদের সামনে সর্বদা উন্মুক্ত।




