ডাইনোসরদের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশালাকার টি-রেক্স বা অন্যান্য দৈত্যাকার প্রাণীর ছবি। কিন্তু আদিমকালের এই সরীসৃপদের মধ্যে কি কখনো ছোট আকারের কোনো প্রজাতি ছিল? গবেষকরা বলছেন, পাখি বাদ দিলে ছোট আকারের ডাইনোসরের জীবাশ্ম প্রায় পাওয়াই যায় না। ইঁদুরের মতো ছোট কোনো ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল ছিল বিজ্ঞানীমহলে। সম্প্রতি একদল গবেষক এই রহস্যের উত্তর খুঁজে বের করেছেন। 'ইভোলিউশন' সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন, কেন ছোট ডাইনোসররা বিবর্তনের পথে টিকতে পারেনি।

গবেষক রজার বেনসন জানান, বিশাল ডাইনোসরদের নিয়ে সবাই আগ্রহী, কিন্তু তারা উল্টো দিক থেকে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করেছেন। ছোট ডাইনোসর কেন ছিল না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও বড় ডাইনোসরদের সম্পর্কে জানার মতোই উত্তেজনাপূর্ণ। ট্রায়াসিক যুগে ডাইনোসরদের আবির্ভাব ঘটে এবং প্রায় ১৮ কোটি বছর ধরে তারা পৃথিবীতে রাজত্ব করে। তবে ৬ দশমিক ৬ কোটি বছর আগে গ্রহাণুর আঘাতে তাদের বিলুপ্তি ঘটে। মানুষের ইতিহাস মাত্র ৩ লাখ বছরের।

গবেষণায় দেখা গেছে, পাখি ছাড়া অন্য প্রজাতির সবচেয়ে ছোট ডাইনোসরের ওজনও ৪০০ গ্রামের নিচে ছিল না, যা প্রায় একটি ফুটবল বলের সমান। আধুনিক যুগের সবচেয়ে ছোট পাখি, ইঁদুর বা টিকটিকির তুলনায় সেই ডাইনোসরটি ২০০ থেকে ৩ হাজার গুণ বড় ছিল। গবেষক বেনসন বলেন, বর্তমান পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাণীই আকারে ছোট, এমনকি সেকালের সবচেয়ে ছোট ডাইনোসরের চেয়েও অনেক ছোট। অনেকের ধারণা, ছোট ডাইনোসরদের হাড়গোড় পাতলা হওয়ায় মাটির নিচে সংরক্ষিত থাকেনি, তাই তাদের জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি। কিন্তু বেনসন ও সহ-গবেষক স্টেফানি লেচকি এই ধারণা মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি, ডাইনোসরের যুগের ছোট ইঁদুর, টিকটিকি ও ব্যাঙের জীবাশ্ম যদি আজ পাওয়া যায়, তবে ছোট ডাইনোসরের হাড় না পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

এই প্রশ্নের সমাধানে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রাণীর শরীরের গঠন ও আকৃতি বিশ্লেষণ করেন। একটি প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য কতটা খাবার বা শক্তি প্রয়োজন, তার ভিত্তিতে তারা একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেন। মডেলটি পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও কচ্ছপের আকারের হিসাবের সঙ্গে সঠিকভাবে মিলে গেলেও টিকটিকি, সাপ, কুমির ও উড়তে না-পারা পাখির ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। গবেষক দলের মতে, এই মডেল তখনই কার্যকর, যখন কোনো প্রাণীর শরীরের অভ্যন্তরীণ কারণ তার আকার নির্ধারণ করে। কিন্তু টিকটিকি ও ডাইনোসরের ক্ষেত্রে বাইরের পরিবেশগত কারণ, যেমন—থাকার জায়গার অভাব বা অন্য প্রাণীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা—তাদের একটি নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে ছোট বা বড় হতে বাধা দিয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সাধারণ ধারণার বিপরীতে ছোট আকারে বেঁচে থাকার লড়াই সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাটির গর্তে লুকিয়ে থাকা, ঝোপঝাড়ে চলাফেরা করা বা অল্প খাবারে বেঁচে থাকার দক্ষতায় ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ছিল সিদ্ধহস্ত। ফলে তারা ছোট ডাইনোসরদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল। অন্যদিকে, বড় ডাইনোসরদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে স্তন্যপায়ীরা বড় শরীর গড়ার সুযোগ পায়নি। তবে পাখিরা উড়ার ক্ষমতার কারণে পরিবেশের নানা সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছোট আকারের শরীর নিয়েই টিকে থাকতে পেরেছিল। গবেষণার সহলেখক স্টেফানি লেচকি বলেন, ছোট স্তন্যপায়ীরা সম্ভবত লড়াইয়ে ছোট ডাইনোসরদের পেছনে ফেলে দিয়েছিল, তাই ডাইনোসররা অত ছোট হতে পারেনি। কুমিরের ক্ষেত্রে হিসাব না মেলার কারণ হলো, বর্তমানে কুমিরের প্রজাতির সংখ্যা অনেক কম, ফলে তাদের মধ্যে আকারের বৈচিত্র্যও কম। তবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাচীন কুমিরদের মধ্যে আকারের অনেক ধরন ছিল, যার খুব সামান্য অংশ আজকের কুমিরদের মধ্যে দেখা যায়।