বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মেডিক্যাল অক্সিজেনের তীব্র সংকট বিরাজ করছে, যার ফলে প্রয়োজনের সময় প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এই জীবনরক্ষাকারী গ্যাসটি পান না। সম্প্রতি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)-এর সেন্টার ফর হেলথ, ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পলিসি সায়েন্সেস আয়োজিত এক নীতি সংলাপে বিশেষজ্ঞরা এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন। সংলাপে গবেষক, জনস্বাস্থ্যবিদ, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি)-র বিজ্ঞানী এবং ল্যানসেট মেডিক্যাল অক্সিজেন কমিশন রিপোর্টের অন্যতম লেখক আহমেদ এহসানূর রহমান মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, অক্সিজেন প্রয়োজন এমন ১০০ জনের মধ্যে ৪৬ জন বিভিন্ন কারণে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে পৌঁছাতে পারেন না। আবার যারা হাসপাতালে যান, তাদের মধ্যে ৮ শতাংশ পর্যাপ্ত প্রস্তুতিহীনতার কারণে এবং আরও ৮ শতাংশ মানহীন সেবার কারণে অক্সিজেন পান না। মূলত তীব্র অসুস্থতা (যেমন: নিউমোনিয়া, কোভিড, যক্ষ্মা, অ্যাজমা), অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদী ফুসফুসের রোগে আক্রান্তদের জন্য এই অক্সিজেনের গুরুত্ব অপরিসীম।

দেশের অক্সিজেনের উৎপাদন ও সক্ষমতা নিয়ে আইসিডিডিআরবি-র ২০২৫ সালের এক মূল্যায়ন রিপোর্টে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট ১০১টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। বছরে ২ কোটি ৩৮ লাখ ঘনমিটার অক্সিজেনের বিপরীতে দেশে উৎপাদিত হয় মাত্র ২ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার। এই ১০১টি প্ল্যান্টের মধ্যে মাত্র ৩৪টি (৩৩.৭%) পুরোপুরি সচল। ৪৭টি প্ল্যান্ট (৪৬.৫%) কার্যকর হলেও মূল্যায়নের সময় চালু ছিল না এবং ২০টি (১৯.৮%) সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী বা অকেজো হয়ে পড়েছে।

আলোচনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহ-অধ্যক্ষ অধ্যাপক নুসারা সুলতানা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান যে, দেশের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা মেডিকেলে অস্ত্রোপচারের সময় মাঝে মাঝে অক্সিজেনের সংকট দেখা দেয়, যার ফলে সিলিন্ডারের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম উল্লেখ করেন, কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে গিয়ে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল, যার অনেকগুলো বর্তমানে অকেজো।

সমাধান হিসেবে আইইউবি উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং চিকিৎসকদের চর্চায় ‘অক্সিজেন থেরাপি’কে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন। রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মানসম্পন্ন অক্সিজেন নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি খাত ও বিজ্ঞানীদের সমন্বিত কাজের কথা বলেন। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা মামুন রহমান বিদ্যুৎ সংকটের কথা মাথায় রেখে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে অক্সিজেন উৎপাদনের প্রস্তাব দেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পরিচালক এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অক্সিজেনের বিলম্ব মানেই জীবনকে অস্বীকার করা। তিনি আরও জানান, আগামী অক্টোবরে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক অক্সিজেন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমআরসি পরিচালক অধ্যাপক কাজী সাইফউদ্দিন বেননূর এবং আইইউবি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যগণ।