দেশের ৪৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যকে সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দায়িত্বশীল পদে থেকে দেওয়া এমন বিভ্রান্তিকর ও অনভিপ্রেত মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের এই প্রতিনিধিরা বলেন, ১১ আগস্ট ঢাকায় আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় মন্ত্রীরা দাবি করেন যে বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই, সকল নাগরিককে শুধুমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিতে হবে এবং জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র বা আইএলও কনভেনশন ১৬৯ বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেনি।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে তারা গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলার শামিল এই বক্তব্য। আদিবাসী পরিচয় ও বাংলাদেশের নাগরিকত্বকে পরস্পরবিরোধী মনে করার কোনো কারণ নেই—একই সঙ্গে তারা রাষ্ট্রের নাগরিক এবং স্বতন্ত্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা আছে, ফলে মন্ত্রীদের এই অবস্থান সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি জাতীয় ঐক্য বা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি নয়, বরং এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত সমাজ গঠনে সহায়ক বলেও উল্লেখ করা হয়।
আইনি প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুসমর্থন না করলেও ১৯৫৭ সালের আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে, যা আইনত বাধ্যতামূলক। ফলে আদিবাসীদের আত্মপরিচয় ও ভূমির অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা, আয়কর আইন ২০২৩, অর্থ আইন ১৯৯৫ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-সহ বিভিন্ন আইনে আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণের বিশেষ বিধান আছে। নির্বাচিত বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশকে ‘রেইনবো নেশনে’ রূপান্তরের অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী না থাকলে কিসের ভিত্তিতে এই রূপান্তরের অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ২০০৩ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বাণী উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি তখন বলেছিলেন যে আদিবাসীরা আমাদের জনগোষ্ঠীরই অংশ এবং তারা অন্য সবার মতো সমান মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশের নাগরিক। ‘দেশে আদিবাসী নেই’—এই তত্ত্বটি ছিল পতিত স্বৈরশাসকের উদ্ভাবন, যা গণতান্ত্রিক সরকারের মুখে শোভা পায় না বলে মন্তব্য করা হয়। মন্ত্রীদের এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে অবিলম্বে এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করার জোর দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, শিরীন পারভিন হক, রাশেদা কে চৌধূরী, ইফতেখারুজ্জামান, শাহীন আনাম, জেড আই খান পান্না, আবু সাঈদ খান, মং উষা থোরাই, শহিদুল আলম, সারা হোসেন, শামসুল হুদা, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, রেহেনুমা আহমেদ, সুমাইয়া খায়ের, সামিনা লুৎফা, জোবাইদা নাসরীন, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, মির্জা তাসলিমা সুলতানা, ফিরদৌস আজীম, ফস্টিনা পেরেইরা, মোশরেকা অদিতি হক, সালমা আলী, পাভেল পার্থ, সায়দিয়া গুলরুখ, রোজিনা বেগম, বিলু কবীর, মনিন্দ্র কুমার নাথ, সালেহ আহমেদ, পারভেজ হাসেম, জাকির হোসেন, সাঈদ আহমেদ, শাহেদ কায়েস, মিঠুন রাকসান, হাফিজ রশিদ খান, দীপায়ন খীসা, জাহেদ হাসান, আমিনুর রসুল, জুয়েল মারাক, ইন্টু মনি তালুকদার, হানা শামস আহমেদ, নাসরিন খন্দকার ও হিরণ মিত্র চাকমা।




