সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এরিক ওয়ারেন্ট দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন অস্ট্রেলিয়ার বোগং মথ নিয়ে। এই ক্ষুদ্র পোকাগুলো প্রায় ৯৬৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পাহাড়ি গুহায় পৌঁছায়—যেখানে তারা আগে কখনো যায়নি। তাদের দলে কোনো বয়স্ক সদস্য থাকে না পথ দেখানোর জন্য, মস্তিষ্কও অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তবু তারা নিখুঁতভাবে গন্তব্য খুঁজে বের করে। ওয়ারেন্টের গবেষণা জানাচ্ছে, এই মথগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে অভ্যন্তরীণ দিকনির্ণায়ক হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু যদি এই চৌম্বক মেরুই উল্টে যায়?
ভৌগোলিক ইতিহাস বলছে, পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ চৌম্বক মেরু একাধিকবার স্থান বদল করেছে। পরিযায়ী পাখি, সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং অন্যান্য প্রাণী যখন থেকে পৃথিবীতে রয়েছে, ততদিনে বেশ কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে—দিক নির্দেশক ক্ষেত্রই যদি উল্টে যায়, তবে এরা কীভাবে টিকে থাকে? সৌরঝড়ের সামান্য প্রভাবে যেখানে কবুতর পথ হারায়, সেখানে পূর্ণ মেরু পরিবর্তনে কী ঘটবে? তবে ভূতাত্ত্বিকরা আশ্বাস দিচ্ছেন, দক্ষিণ আটলান্টিকের ওপর চৌম্বক ক্ষেত্রের দুর্বলতা একেবারেই স্বাভাবিক। শিগগিরই মেরু উল্টে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সর্বশেষ সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার বছর আগে।
ওয়ারেন্ট তিনটি মূল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমত, প্রাকৃতিক নির্বাচন। যেকোনো প্রাণীদলের মধ্যে জিনগত পরিবর্তনের ফলে কিছু সদস্য জন্মায়, যাদের অভ্যন্তরীণ কম্পাস একটু ভিন্নভাবে কাজ করে। সাধারণ অবস্থায় এই ত্রুটিপূর্ণ দিকনির্দেশনার কারণে তারা পথ হারিয়ে মারা যেতে পারে। কিন্তু যখন চৌম্বক মেরু উল্টে যায়, তখন ঠিক ওই “ভুল” কম্পাসধারী সদস্যরাই সঠিক পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। বাকিরা বিলুপ্ত হলেও, এই বিশেষ সদস্যরা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে শূন্যস্থান পূরণ করে। বিশেষ করে পোকামাকড়দের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত ঘটে, কারণ তাদের জীবনচক্র খুব ছোট।
দ্বিতীয়ত, পরিযায়ী প্রাণীরা কখনোই কেবল চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে না। তাদের কাছে বিকল্প উপায়ও রয়েছে—সূর্যের অবস্থান, তারার বিন্যাস, এমনকি আশপাশের গন্ধ। ওয়ারেন্ট একটি কৃত্রিম প্ল্যানেটোরিয়ামে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন, যেখানে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, বোগং মথ তখন আকাশের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি দেখে নিজেদের পথ চিনে নিচ্ছে। মেঘমুক্ত রাতে চৌম্বক সংকেত না থাকলেও তারা বিকল্প পদ্ধতিতে ঠিকই গন্তব্য খুঁজে নেয়।
তৃতীয় কারণ হলো পরিবর্তনের ধীর গতি। মেরু উল্টে যাওয়া কোনো হলিউড চলচ্চিত্রের মতো একরাতের ঘটনা নয়। একটি সম্পূর্ণ চৌম্বক মেরু পরিবর্তনে কয়েক হাজার থেকে ৮০ হাজার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এত দীর্ঘ সময়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রাণীরা নতুন চৌম্বক পরিবেশের সঙ্গে জিনগতভাবে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তাদের অভ্যন্তরীণ দিকনির্ণায়ক যন্ত্রও ধীরে ধীরে নতুন করে ক্যালিব্রেট হয়ে যায়।
ওয়ারেন্ট এখন তাঁর গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে চান। তিনি দেখতে চান, মথদের একই সঙ্গে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত সংকেত দিলে তারা কী প্রতিক্রিয়া দেখায়। ধরুন, প্ল্যানেটোরিয়ামের ভেতর শক্তিশালী চুম্বক দিয়ে উল্টো চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করা হলো, আবার উপরে তারাভরা আকাশও রাখা হলো—এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে মথরা চুম্বক নাকি নক্ষত্র, কোনটিকে বেশি বিশ্বাস করবে? তবে বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনরক্ষাকারী গবেষণাতেই অনুদানের অভাব, সেখানে মথ নিয়ে এমন কৌতূহল-উদ্দীপক কাজের জন্য অর্থ জোগাড় করা বিজ্ঞানীদের জন্য কঠিন। ওয়ারেন্টকে হয়তো শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেটের অনুকরণে “অনলি মথস” নামের কোনো তহবিল সংগ্রহের পথ বেছে নিতে হতে পারে।
বোগং মথের আকার ছোট হওয়ায় গবেষণাগারে তাদের নিয়ে পরীক্ষা চালানো সহজ। কিন্তু বড় আকৃতির প্রব্রজনশীল প্রাণীদের নিয়ে এমন পরীক্ষা করা অত্যন্ত জটিল। তাই প্রকৃতিতে মেরু উল্টে গেলে ঠিক কী ঘটে, তার শতভাগ নিশ্চিত উত্তর পেতে হলে সম্ভবত পরবর্তী মেরু পরিবর্তনের ঘটনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর সেই চাক্ষুষ প্রমাণ দেখার জন্য মানবজাতিকে অন্তত আরও কয়েক হাজার বছর এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হবে। সূত্র: পপুলার সায়েন্স।




