গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে এমন একটি গাছ চোখে পড়ে, যার দিকে অনেকেই ফিরেও তাকায় না। মাঝারি সবুজ পাতার এই গাছের ফুল বিশেষ চোখে পড়ার মতো নয়, ফলও তেমন রঙিন নয়। তবু এর সঙ্গেই লুকিয়ে আছে বাংলার গ্রামীণ ছেলেবেলার সবচেয়ে মজার এক খেলার গল্প। গাছটির নাম পিটুলি; গ্রামাঞ্চলে অনেকে একে ডাকে লাটিম নামে। কোথাও এটি মেড্ডা, কোথাও লাড্ডু, আবার কোথাও মেড়াগোটা কিংবা গোটাগামার নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম ট্রেভিয়া নুডিফ্লোরা, যা ম্যালোটাস নুডিফ্লোরাস নামেও উল্লেখিত। ইংরেজিতে একে বলা হয় ফলস হোয়াইট টিক। এটি ইউফোরবিয়াসি পরিবারের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ।

এই গাছ সাধারণত নদীর ধার, পুকুরপাড়, রাস্তার কিনারা কিংবা বিলের পাশে জন্মায়। জলাভূমি এর পছন্দের ঠিকানা; এমনকি পানির মধ্যেও এটি দিব্যি বেড়ে ওঠে। এটি কোনো শখের গাছ নয়—যেখানে পাকা ফল পড়ে, একসময় সেখানেই নতুন চারা গজিয়ে ওঠে। নদী বা খালের ধারে ভূমিক্ষয়ের সমস্যা লেগেই থাকে বলে অনেক জায়গায় ইচ্ছা করেই এই গাছ লাগানো হয়, যাতে শিকড় মাটি ধরে রাখতে পারে।

গাছটির একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা হওয়া। শীত পেরোলে পুরুষ গাছের গায়ে একটাও পাতা থাকে না। খালি কাণ্ড তখন যেন হাত বাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই সেই পাতাহীন ডালে ঝুরঝুর করে ফুটে ওঠে ছোট ছোট ফুল। অন্যদিকে, ফলের কথা বললে—পিটুলির ফল গোলাকার, মার্বেলের চেয়ে সামান্য বড়। কিন্তু এই ফল মানুষ খায় না, খায় না কোনো পশুপাখিও। বাজারে এর কদর নেই, রান্নাঘরেও জায়গা হয় না।

তাহলে এই ফলের কাজ কী? উত্তরটি লুকিয়ে আছে গ্রামের ছেলেমেয়েদের হাতে। ফলের ঠিক মাঝ বরাবর একটি চিকন কাঠি ঢুকিয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যেত একটি লাটিম। আঙুল দিয়ে মোচড় দিয়ে ছেড়ে দিলে সেটি মাটির ওপর ঘুরত, ঠিক কাঠের লাটিমের মতো। টাকা লাগত না, কারিগরের কাছে যেতে হতো না। গাছতলা থেকে একটি পাকা ফল কুড়িয়ে এনে একটি কাঠি খুঁজে বের করলেই চলত। এ কারণেই ফলটি ধীরে ধীরে ‘লাটিম’ নামে পরিচিতি পায়, এবং পরবর্তীকালে সেই নাম জড়িয়ে পড়ে পুরো গাছের সঙ্গে—কোথাও লাটিমগোটা, কোথাও লাটিমগাছ।

গ্রামীণ উদ্ভিদজগতে এমন নামকরণ নতুন কিছু নয়। কোনো গাছের ফল বা ফুলের সঙ্গে যদি খেলাধুলার যোগ থাকে, নামটি প্রায়ই ঠিক হয়ে যায় সেই ব্যবহার থেকেই। পিটুলির বেলাতেও তা-ই ঘটেছে—নাম এসেছে খেলা থেকে, কোনো গবেষণাগার থেকে নয়। ‘পিটুলি’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে, কিন্তু ‘লাটিম’ নামটির উৎস একেবারে স্পষ্ট। মাত্র একটি ফল ও একটি কাঠি হাতে নিলেই এর কারণ বোঝা যায়।

বর্তমানে শহরে বড় হওয়া অনেকে হয়তো এই গাছটি চোখেও দেখেনি। নদী-খালের পাড় দখল হয়ে যাচ্ছে, বিল-জলাভূমি ভরাট হচ্ছে। যে গাছ একসময় নিজে থেকেই জন্মাত নদীর ধারে ধারে, এখন তাকে খুঁজতে যেতে হয় গ্রামের ভেতরের দিকে। প্লাস্টিকের রঙিন লাটিম এখন দোকানে সহজেই পাওয়া যায়। একটি ফলের ভেতর কাঠি ঢুকিয়ে নিজে হাতে লাটিম বানানোর মতো ধৈর্য ধীরে ধীরে কমে আসছে। যারা এখনো গ্রামে থাকেন, তাদের কাছে হয়তো স্মৃতিটি এখনো টাটকা। আর কিছু বছর পর ‘পিটুলি দিয়ে লাটিম বানানো’ কথাটি হয়তো শুনতে হবে দাদা-দাদির মুখ থেকেই। নিজের হাতে ছুঁয়ে দেখার সুযোগটি তখন আর থাকবে না।