মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আগামী ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বছর হিসেবে রেকর্ড ভাঙতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের মেট অফিস। প্রশান্ত মহাসাগরে বর্তমানে যে শক্তিশালী এল নিনো গড়ে উঠছে, সেটি জীবিত মানুষের স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে প্রবল হতে পারে বলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে।

প্রাকৃতিক এই জলবায়ু ঘটনা সাধারণত দুই থেকে সাত বছরের ব্যবধানে ঘটে এবং প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়। পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে গেলে অথবা উল্টো দিকে বইতে শুরু করলে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে তাপ নির্গত হয়, যা বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে এবং বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন আনে।

বিজ্ঞানীরা এল নিনো ঘোষণা করেন যখন প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে কমপক্ষে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়। বর্তমানে পরিমাপে দেখা যাচ্ছে, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উপরে রয়েছে। মেট অফিসের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ দিকে এই ঘটনা তার শীর্ষে পৌঁছালে তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিকতা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। ১৯৫০ সাল থেকে রক্ষিত রেকর্ডে এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি; সম্ভবত ঊনবিংশ শতাব্দীর পর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা হবে।

গভীর সমুদ্রেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা এই ঘটনাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। কিছু স্থানে একশ মিটার গভীরে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় আট ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। এই গভীর উষ্ণ জল মূলত একটি জ্বালানি ভাণ্ডারের মতো কাজ করবে, যা এল নিনোকে অতিরিক্ত শক্তি জোগাবে।

মেট অফিসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফ বলেছেন, “আমাদের পূর্বাভাসে কখনোই এত তীব্র এল নিনো সংকেত দেখিনি।” তিনি স্পষ্ট করে জানান, এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা দল বার্কলে আর্থের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. জেক হাউসফাদার বলেন, এই ঘটনা আরও অনেক মাস ধরে বিকশিত হবে। তাঁর মতে, এটি রেকর্ড গড়ার ঘটনা হবে—এ বিষয়ে এখন আরও বেশি আত্মবিশ্বাস রয়েছে। কিছু জলবায়ু দল পূর্বাভাস দিয়েছে যে তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা চার ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়াতে পারে। যদি তাই হয়, তবে হাউসফাদারের মতে, এটি পাঁচশ বা এমনকি এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে—যদিও এত দূরের ইতিহাস নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার উপর এর প্রভাব ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে গেছে—২০২৬ সালে এটি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে। ক্যারিবিয়ান ও ক্রান্তীয় আটলান্টিক অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যকলাপও কমে গেছে; চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি নামকরণকৃত ঝড় দেখা গেছে।

ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের আশপাশে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক খরার পেছনে এল নিনো একটি কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় খরা ও বনাগ্নির ঝুঁকি, পাশাপাশি পেরু, ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেতে পারে।

যদিও এই গ্রীষ্মের রেকর্ড ভাঙা তাপপ্রবাহের পেছনে এল নিনো প্রধান চালিকাশক্তি ছিল না বলে মনে করা হয়, তবু শরৎ ও শীতের শুরুতে এর প্রভাব বাড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে ভেজা ও ঝড়ো আবহাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। বিপরীতভাবে, শীতের শেষ দিকে ঠান্ডা আবহাওয়ার সম্ভাবনাও কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে, যদিও এই সংযোগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

এল নিনো চলাকালীন সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তাপ মুক্ত হয়। মেট অফিসের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. নিক ডানস্টোন ব্যাখ্যা করেন, এর ফলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায় বৃদ্ধি ঘটে—বিশেষ করে এল নিনোর শীতকালীন শীর্ষের পরবর্তী ক্যালেন্ডার বছরে। তাই ২০২৪ সালকে পেছনে ফেলে ২০২৭ সালই হতে পারে নতুন উষ্ণতম বছরের রেকর্ড।

এর আগে এই মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সতর্ক করেছিল যে এল নিনোর কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের কোটি কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে পারে।