দেশে প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাস উপলক্ষে অসংখ্য সিরাত মাহফিল, কুইজ প্রতিযোগিতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী নিয়ে এসব আয়োজন থেকে প্রত্যাশা করা হয়, তা মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শৈশব থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যপুস্তকে নবীজির জীবনী সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য পড়ে বড় হওয়া সত্ত্বেও, তার প্রভাব ব্যক্তিগত আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক বা ব্যবসায়িক লেনদেনে তেমন দেখা যায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, সিরাত পাঠের পদ্ধতিতে মূলত দুটি বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রথমত, সিরাতকে শুষ্ক ইতিহাসের ছাঁচে পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে হয় যুদ্ধের সাল, অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা, বংশতালিকা ইত্যাদি। নিহতের সংখ্যা বা অভিযানের তারিখ মনে রাখা জরুরি হলেও, ঘটনার পেছনের নৈতিক শিক্ষা উপেক্ষিত থেকে যায়। উল্লেখযোগ্য হলো, এই পদ্ধতি কোরআনের নিজস্ব ইতিহাস বর্ণনার শৈলীর সম্পূর্ণ বিপরীত। পবিত্র কোরআনে নবী-রাসুলদের কাহিনি বর্ণিত হলেও কোথাও সাল-তারিখ বা ভৌগোলিক স্থানাঙ্কের বিস্তারিত নেই, যতক্ষণ না তা কোনো বিধানের জন্য অপরিহার্য। সুরা ইউসুফে বলা হয়েছে, ‘অবশ্যই তাদের বৃত্তান্তে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে গভীর শিক্ষণীয় পাঠ।’
দ্বিতীয় এবং আরও গুরুতর সমস্যা হলো মদিনার জীবনকে কেবল কয়েকটি যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ঘটনায় সীমিত করে ফেলা। বদর, ওহুদ, খন্দক, হুদায়বিয়ার সন্ধি, মক্কা বিজয়—এই ঘটনাগুলোর বাইরে নবীজির দৈনন্দিন জীবন প্রায় আলোচিত হয় না। অথচ মদিনার ১০ বছরের মধ্যে যুদ্ধ ও বড় ঘটনাগুলো স্থায়ী ছিল কয়েক দিন বা সপ্তাহ। বাকি সাড়ে তিন হাজার দিন তিনি কীভাবে কাটিয়েছেন—স্ত্রীর সঙ্গে আচরণ, সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে ব্যবহার, বাজারে লেনদেন, শিক্ষাদানের পদ্ধতি—এসব বিষয় প্রায় অনুপস্থিত। অথচ সাধারণ মানুষের জীবনে একজন আদর্শ পিতা, স্বামী বা প্রতিবেশীর প্রয়োজনীয়তা যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে অনেক বেশি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য রাসুলের অনুসরণের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে’ (সুরা আহজাব, আয়াত ২১)। ইসলামের ইতিহাসে বর্ণিত আয়েশা (রা.)-এর মতে, ‘নবীজির চরিত্র ছিল কোরআনের জীবন্ত প্রতিমূর্তি।’
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমত, শিক্ষাসিলেবাসে সিরাতকে নৈতিকতা-ভিত্তিক করে সাজানো প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থী কেবল সাল-তারিখ মুখস্থ না করে নবীজির মানবিক গুণাবলি ও আচরণ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, শুধুমাত্র প্রাচীন সিরাত গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানের আলোকে রচিত গ্রন্থের প্রচার বাড়ানো জরুরি। তৃতীয়ত, ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় বক্তৃতায় অলৌকিক ঘটনা বা যুদ্ধের কাহিনির পরিবর্তে নবীজির সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ সচেতনতা ও অমুসলিম প্রতিবেশীদের প্রতি আচরণ নিয়ে বেশি আলোচনা হওয়া দরকার।
সিরাত চর্চা নিছক ইতিহাস পাঠ নয়, বরং কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য একটি জীবন্ত দিকনির্দেশনা। তথ্যের খতিয়ান ও যুদ্ধের ইতিহাসে আবদ্ধ থাকলে তা আবেগ জোগালেও চরিত্র পরিবর্তনে অক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেদিন তরুণ প্রজন্ম বদর বা খন্দকের সাল মুখস্থ করার পাশাপাশি নবীজির দৈনন্দিন জীবনের সততা ও উদারতাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করবে, সেদিনই সিরাত পাঠ প্রকৃত অর্থে ফলপ্রসূ হবে।




