জনপ্রিয় অনলাইন গেম যেমন পাবজি, ফ্রি ফায়ার বা ফিফা—এগুলো ডাউনলোড করতে সাধারণত কোনো অর্থ ব্যয় হয় না। কিন্তু এই গেমগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক মডেল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়, যা অনেকাংশে কিশোর-তরুণদের অজানা এক ফাঁদে ফেলছে।

মোবাইলের পর্দায় একটি চরিত্রের জন্য প্রয়োজন বিশেষ পোশাক বা শক্তিশালী অস্ত্র। সেটি পেতে ব্যয় করতে হয় প্রকৃত অর্থ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দিষ্ট জিনিস কেনা যায় না, বরং ক্রয় করতে হয় একটি ভার্চুয়াল বাক্স—যার ভেতরে কী আছে তা পুরোপুরি অনিশ্চিত। কাঙ্ক্ষিত বস্তু না মিললে আবারও অর্থ খরচের চক্র চলতেই থাকে। এই প্রক্রিয়াটি ইন-গেম পারচেজ নামে পরিচিত।

এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ‘লুট বক্স’ বা ভাগ্যভিত্তিক পুরস্কারের ধারণা। মনোবিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন যে এই পদ্ধতি ক্যাসিনোর স্লট মেশিনের সঙ্গে মিল রেখে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে, যা তীব্র আসক্তি তৈরি করতে পারে। এই অভিন্নতার কারণেই নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের মতো দেশ লুট বক্সকে আইনত জুয়া হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করেছে। যে খেলোয়াড় আর্থিকভাবে সক্ষম, সে এগিয়ে থাকে; যে পারে না, সে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে—এই মনস্তাত্ত্বিক চাপই হলো আসল টোপ।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিনোদন নিষিদ্ধ নয়, তবে সময় ও অর্থকে আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে সফল মুমিনের গুণ বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘তারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৩)। মহানবী (সা.) সুস্থতা ও অবসর সময়কে এমন দুই নেয়ামত বলেছেন যে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ উদাসীন।

অর্থাৎ, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, কেবল ডিজিটাল জগতের একটি ছবির পেছনে বিপুল অর্থ ঢালাকে ইসলামী নির্দেশনার আলোকে অপচয় হিসেবে দেখা হয়। কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপব্যযয়ীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)।

লুট বক্সের বিষয়টি আরও গভীরতর সন্দেহের জন্ম দেয়, কারণ এখানে অর্থের বিনিময়ে অনিশ্চিত কিছু পাওয়ার প্রচেষ্টা জড়িত। রাসুল (সা.) যেকোনো প্রকার অনিশ্চয়তাযুক্ত কেনাবেচাকে নিষিদ্ধ করেছেন, যাকে ফিকহশাস্ত্রের ভাষায় ‘বাইউল গারার’ বলা হয়। অসংখ্য ফিকহবিদ এই ভার্চুয়াল লেনদেনকে উক্ত নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত মনে করছেন। যদিও এ বিষয়ে আলেমদের বিশ্লেষণ এখনো চলমান, ইসলামী নীতি অনুযায়ী সন্দেহজনক কাজ থেকে দূরে অবস্থান করাই নিরাপদ।

শুধু আর্থিক দিক নয়, পরকালীন জবাবদিহিতার প্রশ্নটিও ভাববার বিষয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। গেমের ভেতরের একটি ভার্চুয়াল পোশাকের জন্য সেই প্রশ্নের জবাব কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে।

খবরে প্রায়ই উঠে আসে, গেমের খরচ জোগাতে কিশোররা অভিভাবকের মানিব্যাগ থেকে টাকা তুলছে কিংবা সহপাঠীর ফোন চুরি করছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং গেম কোম্পানিগুলো মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তায় সচেতনভাবেই এমন নকশা তৈরি করেছে। অনলাইন গেম খেলা মন্দ নয়, কিন্তু অর্থ ব্যয়ের আগে বোঝা জরুরি—কে লাভবান হচ্ছে, কী উপায়ে এবং কার অর্থের বিনিময়ে।