ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এ জে আরবেরির সংকলিত ‘মুসলিম সেন্টস অ্যান্ড মিস্টিকস’ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে ইরাকের বসরার প্রখ্যাত সুফি সাধক হাবিব আল-আজামির জীবনচরিত বিধৃত হয়েছে। পারস্যে জন্ম নেওয়া এই সাধক পরবর্তীকালে বসরায় স্থায়ী হন এবং জ্ঞানচর্চার জগতে একজন নির্ভরযোগ্য হাদিস বিশারদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আল-হাসান আল-বসরি ও ইবনে সিরিনের মতো সমকালীন বরেণ্য ব্যক্তিদের সূত্রপরম্পরায় তিনি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

প্রথম জীবনে হাবিব ছিলেন এক ধনাঢ্য সুদখোর ব্যবসায়ী। বসরায় বসবাস করে তিনি প্রতিদিন ঋণগ্রহীতাদের কাছে টাকা তাগাদা দিতেন। পাওনা উশুল না হলেও জুতার ক্ষয়পূরণ বাবদ তিনি একটি অঙ্ক দাবি করতেন। একবার এক ঋণগ্রহীতার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রীকে জুতার ক্ষতিপূরণ চাইলে নারীটি একটি ভেড়ার ঘাড়ের অংশ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। হাবিব তা গ্রহণ করেন এবং রুটি ও জ্বালানি সংগ্রহ করে ফিরে এলে ভিক্ষুকের আগমনে সব খাবার রক্তে পরিণত হয়। এই ঘটনা হাবিবের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

পরদিন শুক্রবার বাচ্চাদের কাছ থেকে ‘সুদখোর হাবিব’ বলে তিরস্কৃত হয়ে তিনি সরাসরি হাসান বসরির মজলিসে উপস্থিত হন। সেখানে হাসানের বক্তব্য শুনে তিনি জ্ঞান হারান এবং পরে তওবা করেন। তওবার পর এক ঋণগ্রহীতাকে দেখে হাবিব বলেন, ‘এতকাল আমার থেকে তোমার পালানোর কথা ছিল, এখন আমারই তোমার থেকে পালানো উচিত।’ তিনি সব ধনসম্পদ দান করে দেন, এমনকি নিজের স্ত্রীর চাদর ও পরনের জামাও ছেড়ে দেন। এরপর ফোরাত নদীর তীরে এক নির্জন কুটিরে আশ্রয় নিয়ে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হন।

হাবিবের স্ত্রী সংসার খরচের জন্য ক্রমাগত অনুরোধ করলে তিনি ‘এক দয়ালু মালিকের অধীনে কাজ করার’ কথা বলেন। দশম দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক গাধাবোঝাই আটা, চামড়াছেলা ভেড়া, তেল, মধু, শাকসবজি ও ৩০০ রুপার দিরহাম তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যায়। এক সুদর্শন যুবক এসব এনে বলে, ‘তুমি তোমার কাজের পরিধি বাড়িয়ে দাও, আমরাও তোমার বেতন বাড়িয়ে দেব।’ এই ঘটনার পর হাবিব দুনিয়াবি সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর সেবায় সমর্পণ করেন।

হাবিবের কেরামতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—এক বৃদ্ধার ছেলেকে দূর থেকে ফিরিয়ে আনার ঘটনা। ছেলেটি কেরমান শহরে থাকাকালে এক বাতাস তাকে তুলে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে, বসরায় দুর্ভিক্ষের সময় হাবিব ধার করে খাদ্যসামগ্রী কিনে দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেন এবং বালিশের নিচে রাখা মানিব্যাগ থেকে প্রতিবারই দিরহাম বের করে ঋণ পরিশোধ করেন।

হাসান বসরির সঙ্গে হাবিবের সম্পর্কের এক ঘটনায় দেখা যায়, হাজ্জাজের কর্মকর্তারা হাসানের সন্ধান পেতে হাবিবকে জেরা করলে তিনি সত্য বলার পরও আয়াতুল কুরসি ও সুরা ইখলাস পাঠ করে হাসানকে অদৃশ্য করে রাখেন। আরেকবার হাসান দজলা নদী পার হতে চাইলে হাবিব পানির ওপর হেঁটে চলে যান এবং হাসানকে বলেন, ‘আপনার হৃদয় থেকে অন্যের প্রতি সব ঈর্ষা মুছে ফেলুন। জাগতিক সব মোহ থেকে অন্তরকে আড়াল করুন।’ হাবিবের মতে, তিনি তার হৃদয় সাদা করেছিলেন বলেই এই ক্ষমতা পেয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, কেরামতির ঘটনাগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই এগুলোকে ধ্রুপদি সাহিত্য ও নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।