আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ রবিবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তৃতীয় দিনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন এ সময় বেশ কিছু ফোনালাপের অডিও উপস্থাপন করেন, যেখানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে আলোচনার চিত্র ফুটে উঠেছে।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের খাওয়ার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন বলে অডিওতে জানা যায়। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মধ্যে হওয়া এক ফোনালাপে কাদের হারুনকে সরানোর কথা জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান বলেন, শেখ হাসিনা খুবই অনমনীয় এবং তিনি নিজে হারুনকে সরাননি, শুধু ডিবি থেকে অন্য দায়িত্বে সরিয়ে ডিএমপিতেই রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘ওনার ড্রেসটা পাল্টায় দিব। ওই ডিএমপিতেই থাকবে অ্যাজ ইট ইজ আর থাকবে শুধু ডিবির জায়গায় সে অন্য আরেকটা দায়িত্ব নিবে।’ সাত দিন ধরে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দিলেও তিনি তা বাস্তবায়ন করেননি বলেও আসাদুজ্জামান জানান। কাদের তখন পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন এবং আসাদুজ্জামান তাকে প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বোঝানোর অনুরোধ জানান।
পরে ওবায়দুল কাদের হারুনের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন বলে প্রসিকিউটর জানান। এই কথোপকথনে হারুনকে কাদের জানান, খাওয়ার ছবি প্রকাশে নেত্রী বিরক্ত। জবাবে হারুন বলেন, খাওয়ার ছবি তোলার নির্দেশ এসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এসবির প্রধান থেকে। কাদের বলেন, ছবিটি নিজের কাছে রাখা উচিত ছিল। হারুন এরপর নিজের বদলি ঠেকাতে কাদেরের সহায়তা চান এবং বলেন, ‘স্যার, এটা যদি অহন স্যার না করেন, তাহলে কিন্তু অর্ডার এহন করে দিবে স্যার। আমি নাই স্যার। ডিবিতে নাই স্যার। অর্ডার করে দিবে।’ উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই হারুনকে ডিবি থেকে বদলি করে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তিতর্কে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ওবায়দুল কাদের, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মধ্যে হওয়া ফোনালাপও উপস্থাপন করা হয়। এতে চট্টগ্রামে সংঘর্ষের বর্ণনা দিয়ে নাছির বলেন, মুরাদপুরে শিবিরের সঙ্গে ফাইটে তিনজন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তাদের (আওয়ামী লীগের) একজনও আছে জানালে নানক তাকে নির্দেশ দেন, ‘আমাদের যেটা মারা গেছে, সেইটার জানাজাটানাজা করেন। সেটাকে ইস্যু করেন।’ নাছির জানান, বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রচারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে প্রসিকিউটর জানান, যেহেতু নিহত ব্যক্তিটি তাদের (আওয়ামী লীগের) লোক ছিল না, তাই তারা সেটিকে ইস্যু করতে পারেননি।
একই দিন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে কাদেরের কথোপকথনেও আলোচনা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস পরিস্থিতি নিয়ে। খায়রুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরে গেছে এবং ক্যাম্পাসটি তাদের হাতে রয়েছে। সিটি ও আশপাশের জেলা থেকে লোক এনে ক্যাম্পাস পুনরুদ্ধারের পরামর্শ দেন কাদের। খায়রুজ্জামান এতে সম্মতি জানান।
২০২৪ সালের ১ আগস্ট যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের সঙ্গে কথোপকথনে কাদের তাকে বাইরে না থেকে ফিজিক্যালি উপস্থিত থাকার তাগিদ দেন। পরশ জানান, তিনি ২৫ তারিখ থেকে ঢাকার বাইরে থাকলেও সার্বক্ষণিক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন।
প্রসিকিউটর আরও বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ধরতে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যা একটি অপরাধমূলক পদক্ষেপ। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাইয়ের ফোনালাপে আসাদুজ্জামান খানকে কাদের জানান, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের ফাইল আইনমন্ত্রীর মাধ্যমে পাঠানো হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর তা চূড়ান্ত হবে। একই দিন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে কাদের ইন্টারনেটের গতি ধীর করে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যার জবাবে পলক প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার কথা বলেন।
এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ। সবাই পলাতক।




