২০২৪ সালের ৪ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে গুলিবিদ্ধ হন মো. শাকিল আহমেদ। ওই সময় তার দুই হাত ও পা ধরে টেনে নেওয়া হচ্ছিল, আর তিনি মুঠোফোনে নম্বর বলছিলেন—‘ভাই, আমার মার নাম্বারটা লেহেন তো...’। ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে অনেকে ধরে নেন তিনি বেঁচে নেই। তবে বেঁচে যান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল তাকে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শাকিল বলেন, প্রথমে মায়ের কথা মনে পড়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন, মারা গেলে যেন তার লাশ মা নিতে পারেন এবং কবর দিতে পারেন। যে নম্বর তিনি দিয়েছিলেন, সেটি আসলে তার বড় বোনের। গুলি লেগেছিল বাঁ নিতম্বে, যা তলপেট ভেদ করে ডান কোমরের কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পড়ে গেলে পুলিশ তাকে মেরে ফেলতে পারে ভেবে তিনি দৌড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই পড়ে যান।
তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মিরপুরের আলোক হেলথকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, রক্ত বন্ধ হচ্ছে না এবং মনে হচ্ছে দুটি গুলি লেগেছে। পরে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার দিন অ্যাম্বুলেন্সে করে উল্টো পথে যেতে হয়েছিল তাকে। জনতা গণভবনের দিকে ছুটছিল, আর তার বোন জানালা দিয়ে মুখ বের করে জায়গা করে দিতে বলছিলেন।
২৬ আগস্ট, তার জন্মদিনে রাতে হঠাৎ করে শরীর থেকে রক্ত বের হতে থাকে। চিকিৎসকেরা এসে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন, কিন্তু এক সপ্তাহ পর আবার একই অবস্থা হয়। তখন চিকিৎসকেরা পা কেটে ফেলার কথাও বলেছিলেন। একপর্যায়ে মলত্যাগের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। বাংলাদেশে চিকিৎসা সম্ভব নয় জানিয়ে তাকে প্রথমে সিঙ্গাপুর ও পরে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। সেখানে আটটি অস্ত্রোপচার হয় এবং কোলোস্টমি ব্যাগ খুলে দেওয়া হয়।
বর্তমানে শাকিলের ডান পা সারাক্ষণ ঝিমঝিম করে এবং মানসিক যন্ত্রণাও রয়েছে। তিনি বিশেষ একটি যন্ত্র ব্যবহার করে মলত্যাগ করেন। থাইল্যান্ডে ছয় মাস চিকিৎসার পর জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় তাকে দেশে ফিরতে হয়। তার বাবা ২০১০ সালে মারা গেছেন। তিনি ও তার মা মিরপুরের সাবলেট বাসায় থাকেন। বড় বোন ও তার স্বামী তাদের সহায়তা করছেন।
শাকিল আবার পড়াশোনা শুরু করেছেন এবং ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ করে ঘরে বসে কিছু আয় করছেন। সরকার নির্ধারিত ‘এ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি এককালীন পাঁচ লাখ টাকা ও মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন তিন লাখ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেও কিছু সহায়তা পেয়েছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কখন যোগ দিয়েছিলেন তা জানাতে গিয়ে শাকিল বলেন, প্রথম দিকে না গেলেও রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা ও সাভারে লাশ পোড়ানোর ভিডিও দেখার পর তিনি আন্দোলনে যাওয়া শুরু করেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে একবার তার শরীরে রাবার বুলেটও লেগেছিল। তিনি এখন হতাশ যে স্বৈরাচারী সরকার বিদায় নিয়েছে, কিন্তু এর বাইরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের শুধু ভাতা দিলেই হবে না, সবাইকে নিয়ে দেশটা নতুন করে গড়তে হবে।
তার মা মোসাম্মৎ সেলিনা জানান, ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা বাড়ছে। তবে দেশের বাইরে চিকিৎসা করানোর জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ তিনি। তিনি সরকারের কাছে আর কিছু চান না।




