বন্দর নগরী চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠেছে। দিনের বড় একটি অংশ জুড়ে লোডশেডিংয়ের কারণে নগরীর অধিকাংশ বাসিন্দাই চরম দুর্ভোগে দিনাতিপাত করছেন। কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে বলে জানা গেছে।

নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী কোহিনূর বেগমের অভিজ্ঞতা এ যন্ত্রণার একটি চিত্র। গ্যাস সংকটের কারণে রান্নাবান্না বিঘ্নিত হওয়ায়, বিদ্যুৎ থাকলে তিনি অন্তত বিকল্প কিছু তৈরি করতে পারতেন বলে জানান। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেই সুযোগটুকুও তার হচ্ছে না। তিনি বলেন, “কারেন্ট কখন যায় বা আসে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। একবার গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টার আগে ফেরে না।” গরমের মধ্যে এই অবস্থা তাকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তুলেছে।

একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আমরিন আলম নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় বাস করেন। অফিস থেকেই দিনে তিন থেকে চারবার লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হবার পর, সন্ধ্যায় বাসা ফিরেও তিনি একই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। গ্যাসের চাপ না থাকায় রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিয়ে তার ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। রাতে রাইস কুকারে চাল বসানোর পরেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ভাত রান্না হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছ।

লালখান বাজারের বাসিন্দা রিকশাচালক মোহাম্মদ শাহজাহানের কষ্ট অন্যদের থেকে ভিন্ন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে সারাদিন রিকশা চালানোর পর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেও তিনি গরমের জন্য বিশ্রাম নিতে পারছেন না। ঘৃণ ঘৃণ লোডশেডিংয়ের কারণে ঘরের ভেতরে থাকাই তার জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুতের এই চরম ঘাটতি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেও চাপে ফেলেছে। প্রবর্তক মোড় এলাকার একটি বেসরকারি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার তাদের অফিসে মোট ১১ বার বিদ্যুৎ যায়, এবং ২৪ ঘণ্টায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। একটানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিং হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জেনারেটর চালু রাখতে গিয়ে জ্বালানি ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ ওই অফিস কর্মকর্তার।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামে বর্তমানে বিদ্যুৎ চাহিদার পরিমাণ ১২৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু বিতরণ দক্ষিণাঞ্চল পাচ্ছে মাত্র ৯৫০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ ঘাটতি রয়েছে ৩০০ মেগাওয়াট। পিডিবি সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম ব্যাখ্যা করছেন, মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়েছে। এর ফলে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করায়, গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদিত হলেও, বর্তমানে তা ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে গেছে। গ্যাস-সংকট কবে নাগাদ নিরসিত হবে এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।