দেশের জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলোতে নতুন করে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস এবং পদায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। চলতি মাসে মন্ত্রিপরিষদ সাবেসহ ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। চাকরির স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ায় ৩০ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্তসাবের পদ শূন্য হয়েছে, আর বদলির ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবের পদও খালি রয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবের পদটি পূরণ করা হয়নি। এছাড়া অক্টোবরে অর্থ বিভাগের সাবি মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার অবসরে যাবেন। এসব শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি হতে পারে, ফলে প্রশাসনের কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাবি ও অতিরিক্ত সাবি পর্যায়েও একাধিক রদবদল হতে পারে।
ইতোমধ্যে কিছু নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ২৯ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন সাবি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. সাইদুর রহমান খান, যিনি আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবি ছিলেন। একই দিনে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবি হিসেবে বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান সাবি পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাবি পর্যায়ের এসব নিয়োগ সরকারের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের অঙ্গীকার। সেখান থেকে অনুমোদন আসার পরই তারা আদেশ জারি করেন, তাই পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।
মন্ত্রিপরিষদ সাবির পদটি সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ হওয়ায় কে এই দায়িত্ব পাচ্ছেন তা নিয়ে সাবালয়ে চলছে জোর আলোচনা। একইভাবে প্রশাসনের বদলি ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণকারী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবি পদটিও কার জন্য নির্ধারিত হবে, সে বিষয়েও ব্যাপক আগ্রহ বিদ্যমান। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সাবি নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জেষ্ঠা সাবি মো. এহছানুল হকের চুক্তির মেয়াদ এই মাসের মাঝামাঝি শেষ হচ্ছে। দুজনই বিসিএস ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। প্রশাসনের একটি বড় অংশ এখন দেখবে, সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বর্তমান ধারা ধরে রাখে, নাকি নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই নতুন পদায়ন বাড়ায়।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই জনপ্রশাসনে বড় ধরণের রদবদল চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাসে ১৪ জন জেষ্ঠ সাবি ও সাবি এবং ১৯ জন অতিরিক সাবিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। একই সময়ে ২৩ জন জেষ্ঠ সাবি ও সাবিক ওএসডি করা হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার গঠনের আগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা মন্ত্রিপরিষদ সাবি শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সাবি এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। তারপর নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সাবি এবং এ বি এম আব্দুস সাত্তারকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সাবি হিসেবে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বর্তমানে মোট ৭৯ জন সাবির মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত, যা কর্মরত সাবিদের প্রায় ২৯ শতাংশ। এই তালিকায় নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সাবি ও জেষ্ঠ সাবি আছেন। একই সঙ্গে ১০ জন সাবিকের চাকরির মেয়াদ শেষ না হলেও তাদের প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে, ফলে তাদের বর্তমানে কোনো দপ্তরিক দায়িত্ব নেই।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পক্ষে যুক্তি হিসেবে কেউ কেউ বলেছেন, অনেক যোগ্য কর্মকর্তা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সময়মতো পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন এবং সাবি পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি। তাই তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সীমিত সময়ের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যৌক্তিক। কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন, অনেক বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশাসনিক দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার ফলে পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারায় বিঘ্ন ঘটছে এবং নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অতিরিক্ত সাবির মতে, এসব কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্বে বা পরামর্শক পরিষদে রাখা গেলেও নিয়মিত সাবি পদে অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করে না। পাশাপাশি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি করে, কেননা একজন সাবির মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা এবং জেষ্ঠ সাবির বেতন ৮২ হাজার টাকার পাশাপাশি আবাসন ও গাড়িসহ ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেছেন, খুব মেধাবী ও বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য সীমিত পরিসরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, তবে এ ধরনের নিয়োগের সংখ্যা কখনই বেশি হওয়া উচিত নয়। এর ব্যতিক্রম ঘটলে জনপ্রশাসনে জটিলতা ও নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বেড়ে যায়।




