২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা একটি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় বুধবার প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ১৪৭ পৃষ্ঠার এই রায়ের বরাত দিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এস এম মইনুল করিম প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন, রামপুরা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান ওই দিন নৃশংসতার নেতৃত্ব দেন।
গত ২৮ জুন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রাশেদুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, এই তিন আসামিই বর্তমানে পলাতক।
এছাড়া সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং গ্রেপ্তারকৃত সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ছিলেন। ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান বেতার বার্তায় অধস্তন পুলিশ সদস্যদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগে দ্বিধা না করার নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বনশ্রী মসজিদের সামনে মো. নাদিম হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন বনশ্রীর একটি বাড়ির কলাপসিবল গেটের অভ্যন্তরে মায়া ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এবং তার নাতি বাসিত খান মুসা (৭) মারাত্মকভাবে আহত হয়।
অপর এক ঘটনায় রামপুরার একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে রড ধরে ঝুলে থাকা যুবক আমির হোসেনকে গুলি করে গুরুতর জখম করেন সাবেক এসআই তরিকুল ও এএসআই চঞ্চল। এসব হত্যা ও গুরুতর জখমের ঘটনায় হাবিবুর, রাশেদুল ও মশিউরের দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল মতামত দেন, অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনায় এই তিন আসামি প্রতিটি অভিযোগের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হলেও তাদের প্রত্যেককে একটি একক সাজা দেওয়া সমীচীন।
অন্যদিকে, পলাতক তারিকুল ও গ্রেপ্তার চঞ্চল পুলিশ বাহিনীর সর্বনিম্ন স্তরের সদস্য এবং তাদের গুলিতে আমির হোসেন মারা যাননি— এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা অপেক্ষাকৃত কম সাজার যোগ্য বলে রায়ে মন্তব্য করা হয়। বিশেষ করে চঞ্চল চন্দ্র সরকার পলায়ন না করে বিচারিক প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন হেফাজতে বন্দী জীবন কাটানোর কারণে সাজায় কিছুটা রেহাই পেয়েছেন; তিনিই একমাত্র আসামি যিনি অবিলম্বে কারাদণ্ড ভোগ করছেন।




