রাজধানীতে আসলেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের বাসায় ঢুঁ মারা এখন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানউল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাহরুল আলমের নিত্যদিনের কাজ। ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত কাজ—যে কারণেই ঢাকায় আসা হোক, এমপির সঙ্গে সাক্ষাৎকে তিনি অগ্রাধিকার দেন। গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিএনপির সমর্থনে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। এবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা থাকায় স্থানীয় এমপি মো. বরকতউল্লা বুলুর সমর্থন নিশ্চিত করাই তাঁর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য। গত শনিবার রাতে প্রথম আলোকে তিনি জানান, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এমপির সমর্থন অপরিহার্য, তাই এলাকায় এলে দেখা করেন, ঢাকায় গেলে বাসায় যান।
বাহরুল আলম একা নন, বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যস্ততার চিত্র প্রায় একই রকম। ক্ষমতাসীন দলের এমপি-মন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, নিজেদের অবস্থান জানানো এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। অনেকে আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজছেন, সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘোরাফেরা করছেন কিংবা সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে এখন বড় সাংগঠনিক প্রশ্ন—দল কি সরকারকে সহযোগিতা করবে, নাকি ধীরে ধীরে সরকারের ছায়ায় হারিয়ে যাবে?
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দীর্ঘদিনের সংগঠনকে সক্রিয় রাখা। ছয় মাস পূর্তিতে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততায় দলীয় রাজনীতি অনেকটাই আড়ালে। দলের নেতারাই স্বীকার করছেন, এ সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল সীমিত। দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে মাঠে দলটির তৎপরতা তেমন চোখে পড়েনি; বরং বিরোধী দলগুলোই সংসদের ভেতরে-বাইরে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছে। এর কিছু বাস্তব কারণও আছে। বিএনপির মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একটি বড় অংশ এখন সংসদ সদস্য, অনেকে মন্ত্রী। জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বেও আছেন দলের নেতারা। ছাত্রদল, যুবদলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, দল সরকারে গেলে সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতা করে, তার অর্থ এই নয় যে দল সরকারে ঢুকে গেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সরকার গঠনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে দ্রুততম সময়ে ঢেলে সাজানো সম্ভব হয়নি। এখন অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনসহ দলের জাতীয় সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে। অন্যদিকে বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ (প্রিন্স) সরকারে দল মিশে যাওয়ার ঝুঁকি অস্বীকার করেন না। তাঁর মতে, নেতারাই এমপি-মন্ত্রী হচ্ছেন, আবার অনেকে স্থানীয় সরকারে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন, তাই সরকারের কর্মকাণ্ড বুঝে নিতে সময় লেগেছে। তবে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে খুব সতর্ক—সরকারের কাজে দলের সহযোগিতা লাগবে, কিন্তু সরকারের ভেতরে দলকে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাস ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো সচল করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির সময়। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেয়। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে থাকা পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানীসহ কয়েকটি কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। সরকারের প্রথম ছয় মাসের একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক হলো রাজনৈতিক পরিসর তুলনামূলক উন্মুক্ত থাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দল ও ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে বিরোধী দলগুলো প্রকাশ্যে সরকার ও ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করছে। গণমাধ্যমের ওপরও আগের মতো চাপ দেখা যাচ্ছে না, সংবাদপত্র সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে এবং নাগরিক সমাজ স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছে।
তবে সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে সংস্কার একটি বড় অস্বস্তির জায়গা। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার ও নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোন সংস্কার দ্রুত করবে, কোনটি পরে করবে—এ নিয়ে দলটির অবস্থানের সমালোচনা করছে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য প্রশ্নটি শুধু সংস্কার বাস্তবায়নের নয়, গণ-অভ্যুত্থানের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরকারের আচরণের দূরত্ব কতটা, সেটিও বিবেচনা করার। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তির ঘাটতি নেই, কিন্তু সরকারের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে সংস্কার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সরকারের প্রথম ছয় মাসে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব, কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়োগকে কেউ কেউ দলীয় নেতাদের ‘পুনর্বাসন’ হিসেবে সমালোচনা করছেন। তবে সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা কেউ অযোগ্য নন, সব যোগ্যতা তাদের মধ্যে আছে।
অর্থনীতি ও জনজীবনের চাপও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব আদায়ের চাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের সমস্যাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতজনিত জ্বালানি সরবরাহ-বিঘ্নের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাসের ঘাটতি এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট শিল্পকারখানার উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে চাপ তৈরি করছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় অংশ মানুষের জীবনযাত্রার ব্য�় কমানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট ও বাজারের চাপ সরকারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের পর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সরকারে দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভীসহ চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ছয় মাস পূর্তির সময় দলকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ৪ জুলাই থেকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। বিএনপির নেতাদের অনেকে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বলেছেন, বিএনপি মাঠে নেই এমন নয়, খুব শিগগির দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে। সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে, আবার দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাবও পড়বে সরকারের ওপর। তাই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে নেতা-কর্মীদের ব্যস্ততার বিপরীতে দলকে মাঠে সক্রিয় রাখাই এখন বিএনপির বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।




