রাজধানীর পুরাতন কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে রোববার বিকেলে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্মানি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানো ব্যক্তিদের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে এমন অনেক লোক রয়েছে যারা গুজব ছড়ায় এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাদের অতীত কার্যকলাপ খতিয়ে দেখে সবার উচিত তাদের ওপর নজর রাখা। অতীতে তারা কী করেছে, তা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে তারা কী করতে পারে, সে দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।
দেশকে স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের কথায় কেউ যেন প্রভাবিত না হয়। তারা যদি অতীতের মতো বিভ্রান্তি ছড়াতে আসে, তাহলে তাদের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে। এই অনুষ্ঠানে জেলার নারীদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গুরুদের সম্মানি প্রদান করা হয়। এছাড়াও অসচ্ছল ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আর্থিক অনুদানের চেক এবং একজন প্রতিবন্ধীকে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের সময় কিছু গোষ্ঠীর ভূমিকার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক ঘটনা এবং বিগত ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই গোষ্ঠীগুলোর কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরের আন্দোলনে বিএনপি ও তার মিত্রদের নেতা-কর্মীরাই গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক ‘সংস্কার’ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, যারা দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে অনুপস্থিত থেকে আজ সংস্কারের কথা বলছেন, তারা মূলত বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, ২০২২ সালে বিএনপিই প্রথম রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছিল এবং এর আগে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই সংস্কারের প্রথম প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছিল।
সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ভাতা প্রদানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
মানুষকে পেছনে রেখে দেশ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত বড় স্লোগানই দেওয়া হোক না কেন, জনগণকে আত্মনির্ভরশীল করতে না পারলে দেশ গড়ে তোলা যাবে না। অন্য দেশের অনুকরণে নয়, বরং বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিটি শ্রেণির মানুষ যেন রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাপ্য মর্যাদা ও সহায়তা পায়, সেভাবেই বাংলাদেশ গড়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
নারীদের ক্ষমতায়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো দেশ এগোতে পারে না। নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতেই ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুবিধা এবং ভালো ফলাফলের জন্য সরকারি সহায়তার কথাও তিনি জানান।
কৃষকদের কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের স্বাবলম্বী করাই সরকারের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে কৃষক কার্ড প্রবর্তন করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে, যা থেকে ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন। সেচ সুবিধা ও পানিসংকট দূর করতে দেশব্যাপী আড়াইশ কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির কথা বলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু সনদ নয়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ভাষার দক্ষতায় পারদর্শী করে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা আবার চালু করার ঘোষণা দেন তিনি।
ধর্মীয় গুরুদের আত্মনির্ভরশীল রাখতে বিশেষ সামাজিক ভাতা প্রদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও জানান, স্বৈরাচারের সময় বঞ্চনার শিকার ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষকের অবসর ভাতার জটিলতা নিরসন করে অর্থ প্রদান সম্পন্ন করেছে বর্তমান সরকার।
বিএনপি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে রাজনীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, শিক্ষায় সহায়তা দেয়, কৃষকের ফসল বাড়ায় এবং কলকারখানা গড়ে তোলে, সেটিই বিএনপির রাজনীতি। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এতে বক্তব্য দেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম, জালাল উদ্দীন প্রমুখ।




