প্রচণ্ড গরম ও কড়া রোদ শরীরের ওপর নানা প্রভাব ফেললেও চুলের বৃদ্ধির গতি ঋতু পরিবর্তনের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলায় বলে প্রমাণিত নয়। অনেকে বিশ্বাস করেন গ্রীষ্মকালে চুল অন্য সময়ের চেয়ে দ্রুত লম্বা হয়, কিন্তু এই বিশ্বাসের পেছনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি মূলত শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে—যেমন জিনগত গঠন, সঠিক পুষ্টির প্রাপ্যতা, হরমোনের ভারসাম্য ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য। বাইরের তাপমাত্রা বা সূর্যালোকের মাত্রা চুলের ফলিকলের কার্যক্রমে তেমন কোনো বড় প্রভাব ফেলে না।

চুলের বৃদ্ধি চক্র চারটি ধাপে বিভক্ত: অ্যানাজেন (বৃদ্ধির ধাপ), ক্যাটাজেন (পরিবর্তনের ধাপ), টেলোজেন (বিশ্রামের ধাপ) ও এক্সোজেন (ঝরে পড়ার ধাপ)। মাথার প্রতিটি চুল নিজস্ব গতিতে দুই থেকে আট বছর পর্যন্ত অ্যানাজেন ধাপে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এই সময় কমে যায়, ফলে চুল পাতলা ও দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ বাহার হাউশমান্ড জানান, জিনগত কারণ, পুষ্টিহীনতা, মানসিক চাপ, কিছু ওষুধ বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে চুলের বৃদ্ধিচক্র ব্যাহত হতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা, আয়রনের ঘাটতি, বড় অপারেশন, দ্রুত ওজন হ্রাস, সন্তান জন্মদান-পরবর্তী হরমোনজনিত পরিবর্তন বা নির্দিষ্ট ওষুধ চুলকে দ্রুত টেলোজেন ধাপে নিয়ে যায়, ফলে কয়েক মাস পর হঠাৎ করেই অতিরিক্ত চুল ঝরতে শুরু করে।

অনেকের ধারণা, গ্রীষ্মে বেশি রোদ পাওয়ার ফলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যা চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই ধারণা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, যদি কারও শরীরে প্রকৃত অর্থে ভিটামিন ডির ঘাটতি থাকে, তবে তা পূরণ করলে চুল পড়া কমতে পারে। কিন্তু যাদের ভিটামিন ডির মাত্রা স্বাভাবিক, অতিরিক্ত রোদ বা ভিটামিন ডি গ্রহণ করে চুল দ্রুত লম্বা করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, বাড়তি ভিটামিন ডি চুলের ঘনত্ব বা সৌন্দর্য বাড়ায় না। সূর্য বা গ্রীষ্মকাল চুল গজানোর পেছনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে খুব অল্প কিছু গবেষণা হলেও সেগুলো এই ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ দিতে পারেনি।

তবে কিছু গবেষণায় ঋতুর সঙ্গে চুল ও দাড়ির বৃদ্ধির সম্পর্ক খোঁজা হয়েছে। ১৯৯১ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, মার্চ মাসে পুরুষদের মাথার প্রায় ৯০ শতাংশ চুল অ্যানাজেন ধাপে থাকে, যা পরে ধীরে ধীরে কমে সেপ্টেম্বরে সর্বনিম্নে পৌঁছায়। অন্যদিকে দাড়ির ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেছে—জুলাই মাসে দাড়ি শীতকালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ দ্রুত বাড়ে। পাঁচ বছর পর করা দ্বিতীয় গবেষণাতেও একই ফলাফল পাওয়া যায়, যা ইঙ্গিত করে যে গ্রীষ্মের শেষের দিকে মাথার চুল সবচেয়ে বেশি বিশ্রামের ধাপে চলে যায়। তবে এই গবেষণাগুলো খুব ছোট পরিসরে পরিচালিত হয়েছিল—প্রথমটিতে মাত্র ১৪ জন ও দ্বিতীয়টিতে ১০ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তাই এই ফলাফল সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।

২০০৯ সালে ৮২৩ জন নারীর ওপর একটি বড় গবেষণা করা হয়, যেখানে সুস্থ নারী ও চুল পড়ার সমস্যায় আক্রান্ত নারীরা অংশ নেন। সেই গবেষণাতেও দেখা যায়, গ্রীষ্মকালেই মাথার সবচেয়ে বেশি চুল বিশ্রামের ধাপে থাকে। এমনকি দাড়ি যদি ৬০ শতাংশ দ্রুত বাড়ে, তবে তা এক মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ০.৩ ইঞ্চি বেশি লম্বা হয়—যা খালি চোখে বোঝা প্রায় অসম্ভব। অতএব, রোদে গেলে শরীরে ‘সেরোটোনিন’ হরমোন বেড়ে মন ভালো থাকতে পারে, কিন্তু চুল দ্রুত লম্বা হওয়া বা চুল পড়া কমানোর কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, চুলের স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য সঠিক পুষ্টি, চিকিৎসকের পরামর্শ ও জিনগত বিষয়ই মুখ্য—ঋতু পরিবর্তন নয়।