ফ্যাশন দুনিয়ায় ডোরাকাটা নকশা যুগের পর যুগ ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। সমান্তরাল রেখার এই ধারা শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ফ্যাশনের একটি চিরন্তন ভাষা হিসেবে বিবেচিত। ফরমাল থেকে শুরু করে ক্যাজুয়াল, এমনকি ঘুমের পোশাকেও ডোরাকাটা নকশার উপস্থিতি লক্ষণীয়। তবে বর্তমানে পোশাকের কাট ও ডিজাইনে নিত্যনতুন পরিবর্তন আসছে, যা এই নকশাকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। ফ্যাশন ডিজাইনার লিপি খন্দকারের মতে, স্ট্রাইপ, চেক ও ডটের মতো মৌলিক নকশা কখনও ফ্যাশনের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায় না। স্ট্রাইপকে ভিত্তি করে অসংখ্য নকশা তৈরি করা সম্ভব, কারণ রেখাগুলোকে নানাভাবে সাজিয়ে অনন্যতা আনা যায়। এই নকশা যেকোনো কাপড় ও কাটের পোশাকেই মানিয়ে যায় এবং একরঙা বা ডট নকশার পোশাকের সঙ্গেও সহজেই মিলিয়ে পরা যায়। পাইপিং, প্লিট বা কলারে ভিন্নতা আনতেও ডোরাকাটা কাপড় ব্যবহার করা যায়। যেমন, আড়াআড়ি ডোরাকাটা জামার সঙ্গে লম্বালম্বি ডোরাকাটা প্যান্ট পরলে একটি ভিন্ন ও আকর্ষণীয় লুক পাওয়া যায়। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য এই নকশা।

রঙ ও গড়নের বৈচিত্র্যই ডোরাকাটা নকশাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ক্লাব হাউসের প্রোডাক্ট রিসার্চ, ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক ও ডিজাইন বিশেষজ্ঞ ইফতেখারুল ইসলাম জানান, নানা রঙের সমন্বয়ে ডোরাকাটা নকশা তৈরি করা যায়। কাছাকাছি রঙের ডোরা কিংবা একই রঙের হালকা-গাঢ় শেডের ব্যবহার কারও কারও পছন্দ হতে পারে। আবার বিপরীত রঙের উজ্জ্বল ডোরাকাটা নকশাও রয়েছে। তবে উপলক্ষ অনুযায়ী রঙ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, সাদার ওপর লাল চওড়া ডোরা একটি 'বোল্ড ফ্যাশন স্টেটমেন্ট' হলেও এটি ফরমাল পোশাক হিসেবে তেমন মানায় না। অন্যদিকে, আকাশি রঙের কাপড়ে সাদা সরু ডোরা একটি ফরমাল লুক এনে দিতে পারে। ক্যাজুয়াল পোশাকে ডোরার প্রস্থে ভিন্নতা থাকতে পারে—একটি সরু, অন্যটি চওড়া কিংবা দূরত্ব সমান না-ও হতে পারে। শীতে তুলনামূলক চওড়া ডোরার পোশাক বেশি দেখা গেলেও গরমের জন্য সরু ডোরা বা সরু-চওড়ার সমন্বয় বেছে নেওয়া যায়।

পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ফ্যাশন ডিজাইনার ও শিক্ষক আফসানা ফেরদৌসী মনে করেন, স্ট্রাইপ ফ্যাশনের একটি চিরন্তন ভাষা। এটি শুধু প্যাটার্ন নয়, বরং পোশাকে ছন্দ, গতি ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সমসাময়িক ফ্যাশনে ডোরাকাটা নকশার ব্যবহার অনেক বেশি সৃজনশীল—যেখানে তির্যক রেখা, মাল্টিডিরেকশনাল স্ট্রাইপ ও সাহসী রঙের ব্যবহার দেখা যায়। মিনিমাল ও কনটেম্পোরারি লুক তৈরিতে এই নকশা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমান ডিজাইনাররা বিভিন্ন টেক্সচার, এমব্রয়ডারি, প্রিন্ট ও তাঁতের কাজের সঙ্গে স্ট্রাইপের সমন্বয় করছেন। একই রঙের বিভিন্ন শেড ব্যবহার করে মনোক্রোম্যাটিক স্ট্রাইপ তৈরি করা হচ্ছে, যা বিশ্ব ফ্যাশনে খুবই জনপ্রিয়। অন্যদিকে, সূক্ষ্ম ডোরাকাটা বা পিন স্ট্রাইপ মূলত ফরমাল পোশাকেই বেশি ব্যবহৃত হয়।

ফ্যাশন হাউস টুয়েলভের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তরুণদের মধ্যে মেটে টোন ও প্যাস্টেল রং অত্যন্ত 'ট্রেন্ডি'। পাশাপাশি উজ্জ্বল রং বা একাধিক রঙের সমন্বয়ও সমান জনপ্রিয়। তাঁরা তুলনামূলক চওড়া স্ট্রাইপের ক্যাজুয়াল পোশাক পছন্দ করছেন, বিশেষ করে নিট বা জার্সি ফেব্রিকে বোল্ড স্ট্রাইপ অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

ডোরাকাটা নকশা এক ধরনের 'ইলুশন'ও তৈরি করে। লম্বালম্বি ডোরা পোশাকে ব্যক্তিকে কিছুটা লম্বা ও ছিপছিপে দেখায়, অন্যদিকে কাঁধের অংশে আড়াআড়ি ডোরা থাকলে কাঁধ চওড়া মনে হয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী পোশাকের নির্দিষ্ট অংশে আড়াআড়ি ডোরাকাটা কাপড় ব্যবহার করা হয়। শার্ট, টি-শার্ট, পোলো, কুর্তা, পাঞ্জাবি, ট্রাউজার, কো-অর্ড, ব্লেজার, প্যান্ট এমনকি শাড়িতেও ডোরাকাটা নকশার ব্যবহার ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। শুধু পোশাক নয়, নানা অনুষঙ্গেও এই নকশা ব্যবহৃত হচ্ছে।