দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আসিফ খানের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ছিল দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে না যেতে পারা। সম্প্রতি সেই আক্ষেপ মিটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দ্বীপ ভ্রমণের মাধ্যমে। সেমিস্টার বিরতির সুযোগে তিনি পাড়ি জমান দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র জেজু দ্বীপে। আগ্নেয়গিরির লাভা গঠিত জেজুর বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক শোভা তাঁকে আকৃষ্ট করে।
প্রথম দিনে হামদক সৈকতে পৌঁছে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার নীল জলরাশি দেখে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় তাঁর। সৈকতের পাশের বিখ্যাত দেলমন্দো ক্যাফেতে স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। উ-দো দ্বীপে যাওয়ার জন্য সংসানপো বন্দরের পরিবর্তে ভুল করে জংদাল বন্দরে চলে যান তিনি। তবে ভুল পথ হয়েও সেখানকার শান্ত পরিবেশ ও নির্মল দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করে। বন্দর পাড়েই গরুর মাংসের তেহারি খেয়ে দুপুরের খাবার সারেন। পরে সংসানপো বন্দরে ফিরে প্রতি ঘণ্টায় ছেড়ে যাওয়া ফেরিতে চেপে উ-দো দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ত্রিশ মিনিটের যাত্রা শেষে দ্বীপে নেমেই সাইকেল ভাড়া করে পুরো এলাকা ঘুরে দেখেন। দ্বীপের লাইটহাউজ, সবুজ চারণভূমি ও লোকালয়গুলি তাঁর নজর কাড়ে।
ফিরতি পথে ক্লান্তি থাকায় ফেরির ছাদে না গিয়ে নিচেই থাকেন তিনি। সংসানপো বন্দরে এসে ট্যাক্সি নিয়ে চলে যান ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য ইলচুলবং-এর পাদদেশে। মেঘলা আকাশ ও ক্ষীণ আলোর মধ্যে পাহাড়ি পথ বেয়ে ওপরে ওঠেন। সেখানে ফিলিপাইনের এক পর্যটক তাঁর কাঙ্ক্ষিত ছবি তুলে দেন। ওপর থেকে চারপাশের দৃশ্য দেখে জেজু ভ্রমণ সার্থক মনে হয় তাঁর। রাতে থাকার জন্য সংউইপোয় চলে যান।
পরদিন সকালে হোটেল ছেড়ে সরাসরি যান জংবাং ওয়াটারফলস। কোরিয়ার একমাত্র জলপ্রপাত হিসেবে এটি পাহাড় থেকে নেমে সরাসরি সমুদ্রে মিশেছে। লকারে ব্যাগ রেখে নিচে নেমে ছবি ও ভিডিও তোলেন। সেখানকার বাতাস ও সমুদ্রের গর্জন উপভোগ করে ওপরে উঠে ডাবের পানি পান করেন। ব্রিটেনের এক পর্যটক পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়, যারা শিশুদের নিয়ে জেজুতে চার দিন অবস্থানের পরিকল্পনা করছিলেন।
পরে ট্যাক্সি করে সানবাংসান ল্যান্ডে পৌঁছান। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পার্কে প্রবেশের সময় তাঁকে ভেড়াদের খাবার দেয়া হয়। কিউট ভেড়াগুলোকে খাইয়ে তিনি ভাইরাল স্লাইড রাইডে অংশ নেন। ছয়বার স্লাইড করে আনন্দ উপভোগ করেন। এরপর যান টি মিউজিয়ামে। সেখানে চা, কফি, কেকের পাশাপাশি চা-ভিত্তিক ত্বকের যত্নের পণ্য, সাবান ও পারফিউম দেখে অভিভূত হন। লাভা থেকে পাওয়া বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি প্রসাধনীও তাঁর নজর কাড়ে। ফ্রিতে বিতরণ করা চাবির রিং ও কার্ড সংগ্রহ করেন। ক্লান্তি দূর করতে খান ট্যাংগারিন বিংসু। চা–বাগানের দৃশ্য দেখে তাঁর মনে পড়ে যায় সিলেটের সবুজ চা–বাগানের কথা।
সর্বশেষ গন্তব্য এওল ক্যাফে স্ট্রিটে এসে সমুদ্রোপকূল ধরে হেঁটে ক্যাফেগুলোর স্থাপত্য ও পরিবেশ দেখেন। বিভিন্ন ক্যাফের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যেমন গ্লাসের ভেতর দিয়ে সমুদ্র দেখা বা কালো লাভাপাথরের মধ্যে বসার ব্যবস্থা তাঁকে মুগ্ধ করে। শেষ বিকেলে ক্যাফে স্ট্রিটের মোহময় পরিবেশ ছেড়ে তিনি বিমানবন্দরে যান। রাতের ফ্লাইটে বুসানে ফেরার সময় জেজুর অসাধারণ স্মৃতি মনে গেঁথে যায়। আসিফ খান জানান, জেজুর মতো ভ্রমণবান্ধব পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে এবং এই ভ্রমণ সেন্ট মার্টিনের আক্ষেপ পূরণের চেয়ে অনেক বেশি কিছু দিয়েছে।




