বিশ্বজুড়ে কোরীয় সৌন্দর্য শিল্পের চিরচেনা ধারণায় বড় রূপান্তর ঘটছে। একসময় কাচের মতো স্বচ্ছ ও ফর্সা ত্বককে সৌন্দর্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে সেই ধারণা থেকে সরে আসছে বেশিরভাগ কে-বিউটি ব্র্যান্ড। এখন গাঢ়, শ্যামলা, জলপাই কিংবা মেলানিনসমৃদ্ধ সব ধরনের ত্বকই সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কে-পপ ও কে-ড্রামার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্ল্যাকপিঙ্ক, বিটিএস কিংবা স্ট্রে কিডসের কনসার্টে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার হাজারো ভক্ত অংশ নিচ্ছেন। তাদের ত্বকের রং ও সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও কে-পপের প্রতি ভালোবাসা সবাইকে এক করেছে। কিন্তু কে-বিউটির বহু ব্র্যান্ড দীর্ঘদিন শুধু হালকা ত্বকের জন্যই পণ্য তৈরি করছিল, বিশেষ করে ফাউন্ডেশন ও কুশন কম্প্যাক্ট মাত্র দুই বা তিনটি শেডে সীমাবদ্ধ ছিল। এই বৈষম্য গাঢ় ও শ্যামলা ত্বকের গ্রাহকদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সমালোচনার মুখে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে ‘টিরটির’ ব্র্যান্ডটি। ২০২৩ সালে তাদের ‘মাস্ক ফিট রেড কুশন ফাউন্ডেশন’ মাত্র তিনটি শেডে পাওয়া যেত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিউটি কনটেন্ট নির্মাতারা অভিযোগ করেন যে তাদের ত্বকের জন্য কোনো উপযুক্ত শেড নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার পর টিরটির প্রথমে শেড সংখ্যা নয়টিতে উন্নীত করে, পরে তা ৪০-এ পৌঁছে যায়। বিশেষ অর্ডারের মাধ্যমে এখন আরও শেড তৈরি করিয়ে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। ব্র্যান্ডটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে শুধু বিক্রিই বাড়েনি, গ্রাহকদের আস্থাও অনেক বেড়েছে। তারা মনে করে, অন্তর্ভুক্তি নিছক প্রচারণা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব।
এই ধারার আরেক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘কে+ব্রাউন’। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা মেলিসা আলফার জানান, কে-পপ কনসার্টে তিনি আফ্রিকান, লাতিন আমেরিকান, দক্ষিণ এশিয়ান এমনকি হিজাব পরিহিত তরুণীদের দেখেছেন, কিন্তু কে-বিউটির পণ্যগুলোতে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এমন একটি স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড তৈরি করেন যা শুরু থেকেই মেলানিনসমৃদ্ধ ত্বকের প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। পণ্য বাজারে আসার আগেই কয়েক হাজার মানুষের অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি হয়ে যায় এবং দক্ষিণ কোরিয়া সরকারও এই উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে।
পুরুষদের সৌন্দর্যচর্চায়ও বড় পরিবর্তন এনেছে কে-পপ। জি-ড্রাগনের মতো তারকা বহু বছর ধরে নারীদের পোশাক ও মেকআপ ব্যবহার করে লিঙ্গভিত্তিক ফ্যাশনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। স্ট্রে কিডসের ফেলিক্সের অ্যাঞ্জেল ও গথিক লুক, এটিজের সিওংহোয়া বা বিটিএসের সদস্যদের নিয়মিত স্কিনকেয়ার ও প্রসাধনী ব্যবহার পুরুষদের সৌন্দর্যচর্চাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। এর অর্থ কে-পপ যেখানে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করেছে, সেখানে কে-বিউটিও ধীরে ধীরে পুরোনো সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসছে।
বিশ্ববাজারে কে-বিউটির মূল্যমান বর্তমানে ৯০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একসময় কোরীয় প্রসাধনী কিনতে বিদেশি ক্রেতাদের অনলাইনের ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ডসহ অসংখ্য দেশের দোকানে সহজলভ্য। দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বিউটি চেইন অলিভ ইয়াং যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রসাধনী বিক্রয়কেন্দ্রগুলোও কোরীয় ব্র্যান্ডকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে আরও এগিয়ে যেতে হলে সব ধরনের ত্বককে সমান গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। দক্ষিণ কোরিয়া নিজেও দ্রুত বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পরিণত হচ্ছে, যা এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈচিত্র্য গ্রহণ এখন শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তাও বটে।
সবমিলিয়ে কে-বিউটির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো শেড সংখ্যার নয়, বরং মানসিকতার রূপান্তর। সৌন্দর্য এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ত্বকের রঙ, বয়স বা চেহারায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ত্বক, পরিচয় ও সৌন্দর্যকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন শিল্পটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে এবং ভবিষ্যতে কে-বিউটি শুধু কোরিয়ার নয়, বরং বিশ্বের সব মানুষের সৌন্দর্যের গল্প বলবে বলে আশা করা যাচ্ছে।




