মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন আয়শা ওয়াহাব। অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সিনেটর হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করা এই রাজনীতিবিদ সাবেক সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া আসনে অনুষ্ঠিত বিশেষ নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেছেন। সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার দক্ষিণ-পূর্বাংশ নিয়ে গঠিত ওই নির্বাচনী এলাকায় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী মেলিসা হার্নান্দেজকে পরাজিত করেন। আগামী জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি সোয়ালওয়েলের অবশিষ্ট সময়ের দায়িত্ব পালন করবেন।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে ওয়াহাব প্রথম আফগান বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছেন। ফস্টার কেয়ারে বড় হওয়া থেকে শুরু করে কংগ্রেসে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ যাত্রা তাঁর জীবনের সংগ্রামের প্রতীক, যা প্রমাণ করে যে সব স্বপ্নই বাস্তবায়নের যোগ্য—বিজয়ের পর দেওয়া বিবৃতিতে এমনটাই উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, যে এলাকা তাঁকে বড় করেছে, সেই এলাকার মানুষের অধিকারের জন্য তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।

তবে এই বিজয় সহজে আসেনি। নির্বাচনের শুরু থেকেই ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী ওয়াহাবকে ঠেকাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট নামে একটি রাজনৈতিক তহবিল আগস্টের শুরু থেকে হার্নান্দেজের পক্ষে প্রায় ২৫ লাখ ডলার খরচ করেছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়। সংগঠনটি ইসরায়েলপন্থী প্রভাবশালী গোষ্ঠী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া আইপ্যাকের অর্থায়নে পরিচালিত আরেক সংগঠন বোল্ড আমেরিকাও প্রায় ১৯ লাখ ডলার ব্যয় করেছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। এত অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও ওয়াহাবের জয় ঠেকানো যায়নি।

বিপুল অর্থ ব্যয়ে পরিচালিত নেতিবাচক প্রচারণার দিকে ইঙ্গিত করে ওয়াহাব বলেন, তাঁর এ বিজয় প্রমাণ করেছে যে এই আসনের ভোটারদের টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। অন্যদিকে সাবেক কংগ্রেস সদস্য এরিক সোয়ালওয়েল গত এপ্রিলে পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেন। তাঁর পদত্যাগের কারণেই এ বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জুনে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক ধাপে ওয়াহাব ৪২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে এগিয়ে যান, যেখানে হার্নান্দেজ পেয়েছিলেন ১৭ শতাংশ। নির্বাচনের মূলপর্ব যত এগিয়েছে, দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান তত কমেছে। আগামী নভেম্বরে আবারও ওয়াহাব ও হার্নান্দেজের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী পূর্ণ দুই বছরের মেয়াদের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হবেন।

গাজা যুদ্ধ নিয়ে ওয়াহাবের অবস্থান এই নির্বাচনকে ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাব পরিমাপের পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আগের তুলনায় কমে এসেছে। গত জুলাইয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক জরিপে দেখা যায়, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মনে করেন গাজায় ইসরায়েল জাতিগত হত্যা চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছে। ওয়াহাবের নির্বাচনী প্রচারে পররাষ্ট্রনীতি প্রধান বিষয় ছিল না। তবে গাজা নিয়ে তাঁর অবস্থান আগে থেকেই স্পষ্ট। গত বছর ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় তিনি গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। চলতি বছরের এপ্রিলে এক বিতর্কে ফিলিস্তিনিদের ওপর যা ঘটছে, তা ‘জাতিগত হত্যা’ কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলেন। অন্যদিকে হার্নান্দেজ সরাসরি উত্তর এড়িয়ে বলেন, ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে, তবে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার আইনসভায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে কাজ করে আসা ওয়াহাবের এই বিজয়ের পর ক্যালিফোর্নিয়ার প্রগতিশীল কংগ্রেস সদস্য রো খান্না তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধের মতো বিষয়ে ওয়াহাবের সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী। ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন চেষ্টা বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াহাবের জয় সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।