গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ সামরিক সংবাদপত্র ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর প্রধান সম্পাদক এরিক স্লাভিন ও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক লারা কোরটেকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। একই সঙ্গে পত্রিকাটির প্রকাশক ম্যাক্স লেডেরারকেও বরখাস্ত করা হয়েছে, যদিও তিনি কয়েক দিন আগেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পেন্টাগনের এই সিদ্ধান্তকে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন সংবাদমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার। সেখানে স্লাভিন স্পষ্ট করে বলেন, সামরিক সদস্যদের জন্য প্রকাশিত সংবাদে সেন্সরশিপ বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা হবে ‘রেড লাইন’—অর্থাৎ চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন। ওই সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছিলেন কোরটেও। তাঁদের দুজনেরই বক্তব্য ছিল—তারা পেন্টাগন, প্রশাসন বা কোনো নীতিনির্ধারকের জন্য নয়, বরং ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর জন্যই কাজ করেন। এই অবস্থানের কারণেই ‘অবাধ্যতা’র অভিযোগ এনে তাঁদের বরখাস্ত করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিভাগ নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের পেন্টাগনে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। নীতিগত বিষয় ও আদালতের লড়াইয়ে প্রশাসন ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও নিউইয়র্ক টাইমস-এর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে। সম্প্রচার নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনকেও ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংযোজন ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এ হস্তক্ষেপ।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে লেডেরার আগামী মাসের শেষের দিকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু তাঁর অজ্ঞাতসারে পেন্টাগন পত্রিকাটিতে একজন নতুন উপপ্রকাশক নিয়োগ করে, যিনি বর্তমানে দায়িত্বে থাকা একজন সামরিক কর্মকর্তা। তিন দশক ধরে পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ও ২০০৭ সাল থেকে প্রকাশকের দায়িত্ব পালনকারী লেডেরার কর্মীদের উদ্দেশে এক চিঠিতে লেখেন, নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর দর্শন ও পত্রিকাটির মূল্যবোধের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বিভাগের বর্তমান দিকনির্দেশনার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। স্লাভিনকে পাঠানো অব্যাহতির নোটিশে বলা হয়, তাঁর কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। একই নোটিশ পেয়েছেন লেডেরারও।
ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট মার্ক শফ জুনিয়র এই বরখাস্তকে ‘পেন্টাগনের পক্ষ থেকে সামরিক বাহিনী নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আরেকটি নির্লজ্জ চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি অবিলম্বে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান। শফ বলেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলার পর একজন সম্পাদককে বরখাস্ত করা গভীর উদ্বেগের বিষয়। স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর নির্ভরশীল প্রত্যেক সাংবাদিক ও সামরিক বাহিনীর সদস্যের উচিত এ নিয়ে সোচ্চার হওয়া।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল গত জানুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’কে যোদ্ধাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো হবে। সেখানে যুদ্ধ পরিচালনা, অস্ত্রব্যবস্থা, শারীরিক সক্ষমতা, প্রাণঘাতী সক্ষমতা ও সামরিক বাহিনী-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। ওয়াশিংটনের গসিপ কলাম নতুন করে প্রকাশ করা হবে না; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনও পুনর্মুদ্রণ করা হবে না। গত এপ্রিল মাসে পত্রিকাটির ন্যায়পাল জ্যাকুলিন স্মিথকে বরখাস্ত করা হয়, যার দায়িত্ব ছিল সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখা। লেডেরার ছিলেন এই পদে দ্বিতীয় পূর্ণকালীন বেসামরিক ব্যক্তি।
গত বৃহস্পতিবার তিনজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে চিঠি দিয়ে জানতে চান, কেন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন উইলিয়াম আরবানকে নতুন উপপ্রকাশক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হেগসেথের নেতৃত্বাধীন পেন্টাগন সংবাদপত্রটির সম্পাদকীয় নীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। স্লাভিন আরও বলেন, আইন ও প্রতিরক্ষা বিভাগের নিজস্ব নীতিমালায় যা বলা আছে, তিনি সেই নীতির পক্ষে। তবে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’কে অবশ্যই সম্পাদকীয়ভাবে স্বাধীন থাকতে হবে বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।
কোরটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি ‘অবাধ্যতা’র অভিযোগে বরখাস্ত হয়েছেন, কারণ তিনি সিবিএসের প্রতিবেদককে বলেছিলেন—তিনি পেন্টাগনের জন্য নয়, পত্রিকাটির জন্য কাজ করেন। ই-মেইলে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও লেডেরার বা কোরটে তাৎক্ষণিক জবাব দেননি।




