দেশের বনাঞ্চলে প্রথমবারের মতো দেখা মিলেছে বিরল প্রজাতির গোঁফওয়ালা বাদুড়ের, যা আগে শুধু দক্ষিণ ভারতের কেরালা ও পশ্চিমঘাট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে ধারণা করা হতো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এই প্রজাতি শনাক্ত করেছেন। গত ৩০ জুন জীববৈচিত্র্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল চেকলিস্টে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক ও প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের বাংলাদেশ অফিসের একজন গবেষক।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ শেষে প্রজাতিটি শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আশীষ কুমার দত্ত জানান, ২০১৭ সালে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি কালভার্টের নিচে পাথরের খাঁজে গোঁফওয়ালা বাদুড়ের একটি কলোনি পাওয়া যায়। প্রথমে ২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট সেখান থেকে তিনটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ১৭ মার্চ ও ১৬ আগস্ট একই স্থান থেকে আরও নমুনা নেওয়া হয়। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি খুলি ও দাঁতের গঠন বিশ্লেষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এটি পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট বলে নিশ্চিত হন তারা।
গবেষক আশীষ দত্ত আরও জানান, এই গোঁফওয়ালা বাদুড় ইনসেক্টিভোরাস, অর্থাৎ এটি প্রচুর মশা ও পোকামাকড় খায়, যা পরিবেশে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা কমাতে সহায়তা করে। সাতছড়ির চিরসবুজ বনাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৫-৮৬ মিটার উচ্চতায় এ প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এ ধরনের বাদুড় সংরক্ষণে পুরোনো কালভার্ট, মৃত গাছের কোটর বা গুঁড়ি, পুরোনো বা পরিত্যক্ত ভবনগুলো সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন গবেষকরা।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে অনিক সাহা, আশিস কুমার দত্ত, শারমিন আক্তার ও সাজেদা বেগম। গবেষকদের মতে, পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটকে 'গোঁফওয়ালা বাদুড়' বলা হয় মুখের চারপাশের সূক্ষ্ম লোমের কারণে। তবে প্রজাতি শনাক্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কানের ভেতরের 'ট্রাগাস', যা বল্লমের মতো আকৃতির এবং কানের দৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেক। বাদুড়টি আকারে ছোট থেকে মাঝারি, গায়ের লোম ঘন ও বাদামি রঙের।
গোঁফওয়ালা বাদুড় এত দিন কেবল দক্ষিণ ভারতের কেরালা ও পশ্চিমঘাট অঞ্চলের বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। সেই অঞ্চল থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে এ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া এর ভৌগোলিক বিস্তৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেছে। ভারতে সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ থেকে এক হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় এ বাদুড়ের দেখা মিললেও বাংলাদেশে পাওয়া গেছে মাত্র ৮৫ মিটার উচ্চতায়, যা প্রজাতিটির অভিযোজনক্ষমতার প্রমাণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ বাদুড়গুলো সাধারণত একা অবস্থান করে, আর বিভিন্ন মৌসুমে কলোনিতে এক থেকে ১০টি পর্যন্ত বাদুড়ের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে পাওয়া নমুনাটির ফোরআর্ম বা ডানার সামনের অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৫ মিলিমিটার। আইইউসিএনের বৈশ্বিক লালতালিকায় পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট তথ্য অপর্যাপ্ত হিসেবে শ্রেণিভুক্ত। গবেষকদের মতে, সাতছড়িতে এ প্রজাতির উপস্থিতি ইঙ্গিত করছে, বাংলাদেশের বনভূমি এখনো অনেক বিরল বন্য প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। তবে পর্যটকদের চলাচল এবং আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকির কারণে এ প্রজাতির সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
অধ্যাপক আশীষ দত্ত বলেন, আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বাদুড়ের প্রজাতি কম শনাক্ত হয়েছে, যার কারণ পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব এবং প্রজাতি শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুল প্রয়োগ। তিনি মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গবেষণার সংখ্যা বাড়ালে আরও নতুন নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাবে দেশে। সাতছড়ি থেকে সংগৃহীত নমুনাগুলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ প্রজাতির বিস্তার, বংশবৃদ্ধি ও বাস্তুসংস্থান নিয়ে আরও গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের।




