কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউট ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিকসের বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ বিশ্লেষণের মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে অবস্থিত ঘটনা দিগন্ত (ইভেন্ট হরাইজন) সম্পর্কে নতুন ধারণা লাভ করেছেন। সিঝেং মার নেতৃত্বাধীন এই গবেষণা দলের কাজ সম্প্রতি নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তারা লাইগো (LIGO) ডিটেক্টরে শনাক্ত হওয়া সর্বকালের সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকর্ষ তরঙ্গ সংকেত GW250114-এর ওপর মনোনিবেশ করেন।
ঘটনা দিগন্ত হলো কৃষ্ণগহ্বরকে ঘিরে থাকা একটি অদৃশ্য সীমানা, যাকে পদার্থবিদেরা 'পয়েন্ট অব নো রিটার্ন' নামে চিহ্নিত করেন। এই সীমানা অতিক্রম করলে কোনো বস্তুই আর মহাবিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে না। এমনকি আলোও এই সীমানা থেকে পালাতে পারে না। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, কৃষ্ণগহ্বরের নিকটে মহাকর্ষের প্রভাবে সময় ধীর হয়ে যায় এবং আলোর পথ বেঁকে যায়। ঘটনা দিগন্তের ঠিক বাইরে আলো তার শক্তি হারিয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে।
প্রায় ১.৩ বিলিয়ন বছর আগে দুইটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার ফলে সৃষ্ট এই মহাকর্ষ তরঙ্গটি গত বছরের ১৪ জানুয়ারি লাইগো ডিটেক্টরে ধরা পড়ে। মহাকর্ষ তরঙ্গ সাধারণত অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও LIGO-র অতি সংবেদনশীল ডিটেক্টরগুলো স্থান-কালের জ্যামিতিতে সামান্য পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম। ড. মা ও তার সহযোগীরা দেখিয়েছেন যে, সংঘর্ষের পর নবগঠিত কৃষ্ণগহ্বর থেকে নির্গত মহাকর্ষ তরঙ্গ তার নিজস্ব ঘটনা দিগন্তের স্বাক্ষর বহন করে। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণনের কারণে স্থান-কালের চাদর টেনে নেওয়ার মতো প্রভাব এই তরঙ্গে প্রতিফলিত হয়।
গবেষণাটি শুধু আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বেরই আরেকটি সফল পরীক্ষা নয়, বরং কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রস্থলের সিঙ্গুলারিটি এবং কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির মতো জটিল ধারণা বোঝার পথও উন্মোচিত করেছে। সিঙ্গুলারিটি অঞ্চলে মহাকর্ষ ক্ষেত্র এতই তীব্র যে পদার্থবিজ্ঞানের পরিচিত নিয়মগুলো আর প্রযোজ্য হয় না। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, গ্র্যাভিটন নামক একটি কাল্পনিক কণা মহাকর্ষ বলের বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে। ঘটনা দিগন্তের নিকটে এই গ্র্যাভিটনগুলোর আচরণ তীব্র হয়ে ওঠে। কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির পূর্ণাঙ্গ সমাধান ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাওয়া তথ্যের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে ধারণা দিতে সক্ষম হবে বলে গবেষকরা মনে করছেন।




