বজ্রপাতের আঘাতে কারও মৃত্যু হলেও অনেকেই বেঁচে ফেরেন। তবে বেঁচে যাওয়াদের জীবন আর আগের মতো থাকে না। ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট রায়ান ব্লুমেনথাল, যিনি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বজ্রপাত বিশেষজ্ঞ, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, বজ্রপাতের ভোল্টেজ এতটাই বেশি যে তা মানবদেহের ভেতর দিয়ে কয়েক লাখ ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক ছন্দ নষ্ট হয়ে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে, শ্বাসতন্ত্র অকেজো হয়ে পড়তে পারে, এমনকি চুল ও পোশাকে আগুন লেগে দেহ পুড়েও যেতে পারে।

একটি বজ্রপাতের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। এই প্রচণ্ড উত্তাপের ফলে চারপাশের বাতাস বিস্ফোরিত হয়ে সৃষ্টি করে কানফাটানো শব্দ। বজ্রপাত সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে ঘটে, তাই অনেক সময় শরীরে বাহ্যিক চিহ্নও থাকে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ মেরি অ্যান কুপারের গবেষণা বলছে, বেঁচে যাওয়াদের মস্তিষ্কের স্নায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মনোযোগের অভাব, বিচারবুদ্ধি কমে যাওয়া, সারাক্ষণ মানসিক আতঙ্ক, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা দেখা দেয়। অনেকেই বিষণ্নতায় ভোগেন।

বজ্রপাতে আক্রান্তদের শরীরে অনেক সময় ফার্ন পাতার মতো অদ্ভুত নকশা তৈরি হয়, যাকে লিচটেনবার্গ ফিগার বলে। ২০২০ সালে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তির শরীরে এ ধরনের নকশা দেখা গেলেও তা ব্যথাহীন ছিল এবং মাত্র দুই দিনের মধ্যে মিলিয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তরল কোষের চারপাশে ছড়িয়ে পড়লে এই নকশা তৈরি হয়।

বজ্রপাতের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো আমেরিকার ন্যাশনাল পার্কের রেঞ্জার রয় সালিভানের। ১৯৪২ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে তিনি মোট সাতবার বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং প্রতিবারই বেঁচে ফিরেছিলেন। প্রতিবারই তাঁর চুল ও জামাকাপড় পুড়ে গিয়ে দেহ জখম হয়েছিল। তবে অদ্ভুতভাবে, সাতবার বজ্রপাত থেকে বেঁচে যাওয়া এই মানুষটি ৭২ বছর বয়সে মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করেন। ১৯৬৯ সালে বজ্রপাতে আক্রান্ত স্টিভ ম্যাশবার্নের পিঠের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তিনি জানান, বেঁচে যাওয়া অনেকেই অসহ্য শারীরিক ব্যথা ও চরম মানসিক অবসাদে ভোগেন। কেউ কেউ আত্মহত্যার চিন্তাও করেন। স্টিভ বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা পরিচালনা করেন, যেখানে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।

আকর্ষণীয় বিষয় হলো, বজ্রপাতে সরাসরি মাথায় আঘাতের ঘটনা মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনা ঘটে সাইড ফ্ল্যাশ এবং গ্রাউন্ড কারেন্টের কারণে। সাইড ফ্ল্যাশে পাশের কোনো গাছ বা খুঁটিতে বজ্রপাত পড়লে তার বিদ্যুতের অংশ ছিটকে শরীরে লাগে। আর গ্রাউন্ড কারেন্টে মাটিতে পড়া বিদ্যুৎ পায়ের কাছে চলে আসে। এ কারণেই মাঠের এক জায়গায় বজ্রপাত হয়ে পুরো পশুর পাল মারা যেতে পারে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি ছিল, কিন্তু সচেতনতা বাড়ায় ২০২২ সালে তা কমে মাত্র ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন—একসময় তালগাছ ও বড় বড় গাছ প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত, কিন্তু সেসব কমে যাওয়ায় খোলা মাঠে প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝড়ের সময় নিরাপদ আশ্রয় নেওয়া এবং শেষ বজ্রপাতের ৩০ মিনিট পর পর্যন্ত ঘর থেকে বের না হওয়াই সর্বোত্তম প্রতিরোধ।