মহাকাশে পণ্য পাঠানোর খরচ যে দ্রুতগতিতে কমছে, তা অন্য কোনো শিল্পে দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা। ইতালির পলিটেকনিকো ইউনিভার্সিটি অব তুরিনের গবেষক ফ্রান্সেস্কো নিকোলির নেতৃত্বে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৬০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রকেট উৎক্ষেপণের খরচ প্রায় ৯৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গবেষণাটি সম্প্রতি পিএনএএস নেক্সাস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা ১৯৬০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৪০৫টি রকেট উৎক্ষেপণের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এই ডেটাবেসে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ভারতসহ অন্তত ১২টি দেশের তৈরি ৩৩০টির বেশি ভিন্ন রকেটের হিসাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রতি ৩৬ ঘণ্টায় একটি করে রকেট পৃথিবী ছেড়ে গেছে, যা মহাকাশ যাত্রার বাণিজ্যিক বিস্তারকে নির্দেশ করে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্কিন ডলারের মান ধরে ১৯৬০ সালে মহাকাশে এক কেজি ওজনের বস্তু পাঠাতে খরচ পড়ত প্রায় ৮৭ হাজার ২৩ ডলার। ২০২৫ সালে এসে সেই একই ওজনের জিনিস পাঠাতে খরচ হচ্ছে মাত্র ৩ হাজার ৮৬৮ ডলার। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যালেসিও তেরজির মতে, মহাকাশ শিল্পের খরচ কমানোর এই কৌশল অন্যান্য শিল্পের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। গবেষকরা আরও দেখেছেন, মহাকাশে পাঠানো মোট জিনিসের পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি কেজি বস্তু পাঠানোর গড় খরচ ২১.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা সোলার প্যানেলের খরচ কমানোর হারকেও ছাড়িয়ে গেছে।
খরচ কমার পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। প্রথমত, স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মহাকাশ ব্যবহারের প্রবণতা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রগুলো খরচ না দেখে নিজেদের মর্যাদার লড়াইয়ে রকেট উৎক্ষেপণ করলেও বাণিজ্যিক মহাকাশ যাত্রা শুরু হওয়ার পর হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আসে। দ্বিতীয়ত, স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের পুনঃব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি খরচ একদম তলানিতে নামিয়ে এনেছে। একবার ব্যবহার করে রকেট ফেলে না দিয়ে বারবার ব্যবহারের এই প্রযুক্তি খরচ কমানোর ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
গবেষকদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে মহাকাশে এক কেজি বস্তু পাঠানোর খরচ মাত্র ১ হাজার ৬০০ ডলারে নেমে আসতে পারে। ২০৪০ সালে তা আরও কমে ৩০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে এই অগ্রগতির পথে তিনটি বড় বাধা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
প্রথম সমস্যা হলো মহাকাশের আবর্জনা বা স্পেস জাঙ্ক। কক্ষপথে থাকা ধ্বংসাবশেষগুলো ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে বেড়ায়, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। ১৯৭৮ সালে নাসার বিজ্ঞানী ডোনাল্ড কেসলার এই ভয়াবহ অবস্থার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যা কেসলার সিনড্রোম নামে পরিচিত। দ্বিতীয় সমস্যা হলো একচেটিয়া আধিপত্য। বর্তমানে মহাকাশে পাঠানো মোট জিনিসের প্রায় ৭৫ শতাংশ স্পেসএক্সের মাধ্যমে যায়, যা বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে। তৃতীয় সমস্যা ভূ-রাজনৈতিক। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো দেশই স্পেসএক্সের মতো একটিমাত্র মার্কিন কোম্পানির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চাইবে না, ফলে নিজস্ব প্রযুক্তির পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করলে সার্বিক খরচ আবার বাড়তে পারে।
গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মহাকাশ খাত এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো হিসাব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মহাকাশ খুব শিগগিরই শুধু পরাশক্তিদের একচেটিয়া জায়গা থাকছে না।




