গণিতের জগতে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল এ বছর পেয়েছেন চার তরুণ প্রতিভা। ৪০ বছরের কম বয়সী গণিতবিদদের জন্য এই পুরস্কারকে গণিতের নোবেলও বলা হয়। এবারের বিজয়ীদের মধ্যে অন্যতম হলেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাকব জিমারম্যান। ৩৮ বছর বয়সী এই গণিতবিদ সংখ্যাতত্ত্বের জটিল একটি সমস্যা সমাধানের জন্য এই স্বীকৃতি পেয়েছেন।

জিমারম্যানের গবেষণার মূল ভিত্তি ছিল আন্দ্রে-ওর্ট কনজেকচার। ২০২১ সালে তাঁর নেতৃত্বে একদল গণিতবিদ এই বহুল চর্চিত গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেন। বিষয়টি বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। বিশাল গোলকধাঁধার ভেতরে ছড়িয়ে থাকা কিছু বিশেষ বিন্দু এলোমেলো মনে হলেও, এই কনজেকচার বলে যে সেগুলো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক কাঠামোর ওপর অবস্থান করে। উচ্চতর মাত্রার জটিল জ্যামিতিক গঠনে এই বিন্দুগুলোর আচরণ তিনি গণিতের ভাষায় নির্ভুলভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তাঁর পিএইচডি উপদেষ্টা পিটার সারনাক মন্তব্য করেছেন, এ ধরনের মৌলিক সমস্যার সমাধান গণিতের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

জিমারম্যানের জন্ম রাশিয়ার কাজান শহরে। ১৯৯০ সালে তাঁর পরিবার ইসরায়েলে এবং পরে ১৯৯৬ সালে কানাডায় স্থায়ী হয়। ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। ২০১১ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে ২০১৪ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানেই সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে তাঁর দীর্ঘ সাধনা।

ফিল্ডস মেডেল জয়ের পর জিমারম্যান এখন পুরোপুরি নতুন পথে হাঁটতে চান। সংখ্যাতত্ত্ব ছেড়ে তিনি ডুব দিতে চান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে। তাঁর মতে, সংখ্যাতত্ত্বের আসল কাজ শুধু উত্তর খোঁজা নয়, বরং নতুন প্রশ্ন তৈরি করা। যেমন, ১৬৩৭ সালে ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে দ্য ফার্মা একটি সমীকরণ লিখেছিলেন: aⁿ + bⁿ = cⁿ। তিনি বলেছিলেন, n-এর মান ২-এর বেশি কোনো পূর্ণসংখ্যা হলে এই সমীকরণের কোনো সমাধান থাকবে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গণিতবিদেরা এই ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণে ব্যর্থ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত নব্বইয়ের দশকে অ্যান্ড্রু ওয়াইলস আধুনিক সংখ্যাতত্ত্বের সাহায্যে এর সমাধান করেন। ওয়াইলসের ব্যবহৃত পদ্ধতি এখন স্ট্রিং থিওরির মতো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানেও কাজে লাগছে।

জিমারম্যানের কাছে এআই এখন তাঁর কাজের গতি দ্বিগুণ করে দিয়েছে। বড় গবেষণাপত্র পড়ে সারাংশ তৈরি বা গাণিতিক প্রমাণের খসড়া তৈরির মতো কাজ এআই নিমেষেই করে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, খুব শিগগিরই এআই গাণিতিক কাজে মানুষের চেয়ে বেশি দক্ষ হবে। তবে তিনি এআইকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবেও দেখেন। তাঁর ভাষ্য, ‘অনেকের চোখেই আমার ধারণাগুলো চরমপন্থী মনে হতে পারে। কিন্তু আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, এআই সমাজ এবং মানবজাতির জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর ভেতরে কী ঘটছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো গাণিতিক বা তাত্ত্বিক ভিত্তি এখনো তৈরি হয়নি। জিমারম্যানের লক্ষ্য, গণিতের সাহায্যে এই সিস্টেমগুলোর একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করা, যাতে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পথে চালিত করা যায়।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস