মার্কিন পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত এক নাটকীয় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার চালিকাশক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এর বিশাল জ্বালানি চাহিদা। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন ও মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা সরাসরি পারমাণবিক প্রকল্পে অর্থায়ন করছে এবং প্রায় ১০ গিগাওয়াট ক্ষমতা নিশ্চিত করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এর ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যে কাজে গত কয়েক দশক ধরে প্রথাগত ইউটিলিটি কোম্পানিগুলো সফল হতে পারেনি। পারমাণবিক শক্তির অবিরাম, নির্ভরযোগ্য এবং কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎপাদন এআই-এর চব্বিশ ঘন্টার চাহিদার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
১৯৭৯ সালে পেনসিলভানিয়ার থ্রি মাইল আইল্যান্ডের একটি চুল্লি প্রায় সম্পূর্ণ বিগলনের মুখোমুখি হয়। এই ঘটনা আমেরিকাকে পারমাণবিক শক্তির ব্যাপারে কুণ্টিত করেছিল এবং পরবর্তী চার দশকের জন্য নতুন চুল্লি নির্মাণে নিরুৎসাহিত করেছিল। এখন, সেই থ্রি মাইল আইল্যান্ডের বন্ধ হয়ে যাওয়া আরেকটি চুল্লি (ইউনিট ১) পুনরায় চালু করতে কর্মীরা কাজ করছেন, যার নাম বদলে রাখা হয়েছে ক্রেন ক্লিন এনার্জি সেন্টার। শিল্পভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা সংস্থা এনার্জি সেন্ট্রালের বরাত দিয়ে জানা যায়, মাইক্রোসফট এর পেছনে ১৬ বিলিয়ন ডলারের একটি ২০ বছরের চুক্তি করছে। প্লান্টটি ২০২৭ সালের শেষে ফের চালু হলে এর পুরো বিদ্যুৎটাই কিনে নেবে মাইক্রোসফট। এই বিদ্যুৎ বসতবাড়ি বা কারখানায় যাবে না; এটি সরাসরি তাদের AI ডেটা সেন্টারগুলোকে চালাবে, যেখানে সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। যে প্ল্যান্ট একসময় পারমাণবিক বিদ্যুতের পতনের প্রতীক ছিল, সেটি এখন চ্যাটবট চালাবে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন চুক্তি নয়। এটি একটি নতুন ধারার অংশ, যা আমেরিকার জ্বালানির ভবিষ্যৎ কে নিয়ন্ত্রণ করবে, তা বদলে দিচ্ছে। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা প্রতিটি ১০টি করে নতুন পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে, যা কয়েক দশকে উত্তর আমেরিকায় সবচেয়ে বড় সমন্বিত পারমাণবিক উদ্যোগ। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রতিটি বড় AI কোম্পানি একাধিক পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যার মোট সক্ষমতা প্রায় ১০ গিগাওয়াট, যা প্রায় ৭০ লাখ বাড়িকে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধা রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বিষয়টি পরিস্কার করে বলেছেন, "কম কার্বন নিঃসরণ, চব্বিশ ঘন্টা নির্ভরযোগ্যতা, অতি-উচ্চ শক্তি ঘনত্ব, গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও প্রকৃত সম্প্রসারণযোগ্যতা এই পাঁচ চাহিদা একমাত্র পারমাণবিক শক্তিই মেটাতে পারে।"
বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০,০০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টারও বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ধনী দেশগুলোতে এ বৃদ্ধির পাঁচ ভাগের এক ভাগের জন্য দায়ী হবে ডেটা সেন্টারগুলো। দশকের শেষে, যুক্তরাষ্ট্রের AI ডেটা প্রক্রিয়াজাতকরণে অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত, সিমেন্ট ও রাসায়নিক শিল্পের সম্মিলিত চাহিদার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, মার্কিন গ্রিডে সংযোগের অপেক্ষমাণ প্রকল্পগুলোর তালিকা ২,৬০০ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে এবং গড় অপেক্ষার সময় প্রায় পাঁচ বছরে গিয়ে ঠেকেছে।
এই বিপুল চাপই চুক্তিগুলো চালিত করছে। মেটা ৬.৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষার করেছে। গুগল দুইটি পারমাণবিক উন্নয়নকারী কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছন এবং নতুন সক্ষমতার জন্য আলাদা একটি চুক্তিও করেছে। অ্যামাজন এক্স-এনার্জিতে ৭০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এক ডজন পর্যন্ত ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য।
তবে এই বিনিয়োগ সম্পূর্ণ সমালোচনামুক্ত নয়। বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর এক নিবন্ধে গবেষকরা যুক্তি দিয়েছেন, পারমাণবিক ও ক্ষুদ্র চুল্লিগুলো “আগামী কয়েক বছরের মধ্যে, যখন AI-সংশ্লিষ্ট জ্বালানি চাহিদা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়বে, তখন ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচে কোনো উল্লেখযোগ্য সরবরাহ যোগ করতে অক্ষম।” তারা আরও উল্লেখ্য করেন, বর্তমান প্রযুক্তি বিনিয়োগ “একটি চুল্লি নির্মাণের প্রকৃত ব্যয়ের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান, ডেটা সেন্টারের চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় ডজন খানেক চুল্লি নির্মাণ তো দূরের কথা।” তবে বাস্তবতা দ্বিবিধ। নতুন নির্মাণ কাঠামো বছর দূরের হলেও, থ্রি মাইল আইল্যান্ডের মতো পুনঃচালু প্রকল্প দু-তিন বছরের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরছে, যা এই ক্রান্তিকালে সময় কিনে দিচ্ছে।
গ্রোসি মনে করেন, AI ও পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধির রেখা এখন সমান্তরালে চলছে। প্রযুক্তি দানবরা পারমাণবিক শক্তির ক্রেতা হয়ে ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারাই এখন এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকে পরিণত হয়েছে। যে দেশ বা কোম্পানি নির্ভরযোগ্য, কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎয়ের সাথে AI কম্পিউটিং শক্তিকে দ্রুততম সময়ে সংযুক্ত করতে পারবে, তারা হয়তো ঠিক করবে কেবল জ্বালানি প্রতিযোগিতায় নিশ্চিত নয়, বরং AI প্রতিযোগিতায়ও কে জয়ী হবে।




