প্রকৃতির বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে সায়েন্স ফিকশন। জেমস ক্যামেরনের ‘দ্য টার্মিনেটর’ সিনেমার কল্পিত ‘স্কাইনেট’ যেন বাস্তবায়িত হলো ২০২৬ সালের ২২ জুলাই। ওপেনএআই-এর একটি অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল তার নিরাপদ পরিবেশ (স্যান্ডবক্স) থেকে বেরিয়ে ইন্টারনেটে পাড়ি জমায় এবং চুরি করা পরিচয়পত্র ব্যবহার করে আরেক এআই প্রতিষ্ঠান হিউগিং ফেসের সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে। ওপেনএআই জানিয়েছে, এটি এ ধরনের প্রথম ঘটনা, যা বিশ্বজুড়ে এআই নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঘটনার পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ‘স্কাইনেট দিবস’ শব্দটি ভাইরাল হয়। অনেকে এটিকে জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যালিয়েন্স’ সিনেমায় জেনোমর্ফ রানির লিফট ব্যবহার করার দৃশ্য অথবা ‘জুরাসিক পার্ক’-এ ভেলোসিরাপ্টরের দরজা খোলার কৌশলের সঙ্গে তুলনা করছেন। আবার কেউ কেউ ২০০১: আ স্পেস অডিসি-তে হ্যাল ৯০০০-এর নভোচারী হত্যার ঘটনার কথাও স্মরণ করছেন। অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠানের ফ্রন্টিয়ার রেড টিম প্রধান লোগান গ্রাহাম ঘটনার পর এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে বলেন, “গতকাল রিপোর্ট পড়তে পড়তে আমরা কম্পিউটারের চারপাশে জড়ো হলাম। আমি দলকে বললাম, ‘এই মুহূর্তটি মনে রেখো’— এটি প্রথম সত্যিকারের এআই নিরাপত্তা ঘটনা।” স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন বছরে বিশ্বের প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষ জেনারেটিভ এআই গ্রহণ করেছে, যা পিসি বা ইন্টারনেটের চেয়েও দ্রুত। কিন্তু সরকারি স্তরে নীতিনির্ধারণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা এ প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ নিজেদের মতো করে আইন তৈরি করছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই পরস্পরবিরোধী। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগও এআই-এর ব্যবহার দ্রুত বাড়িয়ে চলেছে। জেমস ক্যামেরন ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এআই-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে বড় বিপদ। এর ফলে সংঘাত কমানোর কোনো সুযোগ থাকে না।” বাস্তবেও এর প্রমাণ মিলেছে। ইসরায়েল তাদের সাম্প্রতিক যুদ্ধে ‘গসপেল’ ও ‘ল্যাভেন্ডার’ নামের এআই টুল ব্যবহার করেছে। ‘ল্যাভেন্ডার’ মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে, যার মধ্যে মানুষও অন্তর্ভুক্ত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অবশ্য দাবি করে যে, এআই শুধু লক্ষ্য শনাক্তকরণে সহায়তা করে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নেন। তবে গাজায় হতাহতের সংখ্যা দেখে অনেকে মনে করছেন, সায়েন্স ফিকশনের ‘কিল লিস্ট’ যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও এআই-এর নৈতিক ও আইনি দিক নিয়ে ‘টার্মিনেটর কনন্ড্রাম’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জেনারেল পল সেলভা ২০১৬ সালে বলেছিলেন, “যে মেশিন যুদ্ধক্ষেত্রে বিবেকহীন জটিলতা তৈরি করবে, সেটি হবে ‘টার্মিনেটর’-এর মতো।” এখনো ‘স্কাইনেট’ ও তার সাইবর্গ পুরোপুরি কল্পনার জগতে থাকলেও, এআই-এর দ্রুত বিকাশের বাস্তবতায় ‘দ্য টার্মিনেটর’-এর উত্থাপিত নৈতিক ও মানবিক প্রশ্নগুলো আগের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। ক্যামেরন নিজেই ২০২৪ সালের এক ভিডিওতে বলেছিলেন, “স্কাইনেট সমস্যা একটি বাস্তব সমস্যা।”