বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক পল্লবী রায়। শনিবার বিকেলে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ডায়রা) আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৬’ সম্মেলনে ‘হোয়েন বর্ডার্স ক্যাননট সেপারেট পলিটিক্স: ওয়েস্ট বেঙ্গলস পলিটিক্যাল ট্রান্সিশন, হোয়াই ইট হ্যাপেনড, অ্যান্ড ইটস ইমপ্যাক্ট অন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একক বক্তৃতায় তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

তাঁর ভাষ্যমতে, পশ্চিমবঙ্গকে শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, কারণ এই রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের এক অনানুষ্ঠানিক সেতু বা বাফার হিসেবে কাজ করে আসছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দল ভিন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গ প্রায়ই দুই দেশের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করেছে এবং উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রেখেছে। তবে এই বাফার দুর্বল হয়ে পড়লে তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। সীমান্ত আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেননি তিনি।

বক্তৃতায় পল্লবী রায় ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত দেন। তাঁর মতে, দিল্লি যদি আবারও উন্নয়ন সহযোগিতা ও অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে বর্তমান সরকারের জন্য সেই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। কারণ, বাংলাদেশের জনমনে ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

তিস্তার পানিবণ্টন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সমস্যাকে শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। নদীটির প্রবাহের বড় অংশ সিকিমের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই শুধু পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; কেন্দ্রীয় সরকার ও সিকিমের ভূমিকাও বিবেচনায় নিতে হবে।

বক্তৃতার শেষ অংশে পল্লবী রায় পরিচয়ের রাজনীতিকে ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, চ্যালেঞ্জটি কেবল নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং ধর্মীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে ‘বাঙালি’ পরিচয়কে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য করা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। তিনি উল্লেখ করেন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এটি ভারতের একটি রাজ্যের পরিচয়ের বিষয়, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। ভবিষ্যতে ‘বাঙালি’ পরিচয় ও জাতীয় পরিচয়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহাবস্থানকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও ইতিবাচক হবে বলে মত দেন তিনি।