রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে বঙ্গভবনের ঠিক সামনে এবং পুলিশ সদর দপ্তরের অদূরে অবস্থিত গুলিস্তান। গুগলের মাপজোখ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বাসভবন থেকে এই এলাকার দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার; পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে প্রায় ৬০০ মিটার। কয়েক মিনিটের হাঁটার মধ্যেই সচিবালয় ও সিটি করপোরেশন। তবু জায়গাটি যেন অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটি। প্রথমবার চার বছর আগে নারায়ণগঞ্জ যাত্রার পথে লেখক বন্ধুকে সতর্ক করেছিলেন—মুঠোফোন চুরি হতে পারে। কিন্তু বাস থেকে নেমে গুলিস্তান পেরিয়ে অন্য বাসে ওঠার পরই তিনি দেখেন, নিজের ফোনটিই উধাও। কখন পকেটমার নিয়ে গেছে, তিনি টের পাননি। ৯ আগস্ট আবারও সেখানে গিয়ে স্কয়ার মোড়ের জুতা বিক্রেতা সোলাইমান কবিরকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, কিছুই বদলায়নি। বাসের জানালা দিয়ে যাত্রীদের কানের দুল, কখনো ফোন টেনে নিয়ে যাওয়া চোখের সামনেই ঘটে; পকেটমারার ঘটনা প্রতিদিনের।
অথচ ‘গুলিস্তান’ শব্দের অর্থ ফুলের বাগান। শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ‘ঢাকাকোষ’ অনুযায়ী, রমনার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের উত্তরে ১৯৫৩ সালে একটি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এলাকাটির এই নাম। প্রথমে হলটির নাম ছিল লিবার্টি; পরে গুলিস্তান করা হয়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে চলচ্চিত্র ও শিল্প-সংস্কৃতির জন্য এলাকাটি খুব বিখ্যাত ছিল। এখন তা বিশৃঙ্খল ও অপরাধপ্রবণ বলেই পরিচিত।
সেখানে হেঁটে চলাচল করা এখন কঠিন। গুলিস্তান অপরিচ্ছন্ন; ফুটপাত ও রাস্তার বড় অংশ হকারদের দখলে। ৯, ১০ ও ১১ আগস্ট পরপর তিন দিন সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সব ফুটপাতে এবং রাস্তার অংশে অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে। হকারদের কাছ থেকে চাঁদা ওঠানো হয়। ৯ আগস্ট বিকেলে ঢাকা ট্রেড সেন্টার মার্কেটের উত্তর পাশে ফুটপাতে এক ব্যক্তি ১০০ টাকা করে নিচ্ছিলেন। কীসের টাকা জানতে চাইলে তিনি ‘খাজনার টাকা’ বলেন; নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও হকাররা তাঁর নাম জাহাঙ্গীর বলে জানান।
হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, চাঁদার পরিমাণ দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ টাকা। বিপণিবিতান ঘেঁষে ফুটপাতে দোকান বসাতে মাসিক ‘ভাড়া’ ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। পোশাক বিক্রি করা এক হকারের ভাষায়, ‘আগে একদলের নেতারা খেয়েছে, এখন আরেক দলের নেতারা খাচ্ছে।’ ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
ইতালিয়ান সোসিওলজিক্যাল রিভিউতে ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘নগর, অনানুষ্ঠানিকতা ও দারিদ্র্য: ঢাকা শহরের হকারদের মেরুকরণ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, গুলিস্তানসহ ঢাকার পাঁচটি এলাকায় ফুটপাতে ব্যবসা চালানো হকারদের ৭০ শতাংশকে কোনো না কোনো পক্ষের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করতে হয়। তাঁদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ৩৫ শতাংশ পুলিশ, সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং ১৪ শতাংশ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সমঝোতা করেন।
চাঁদাবাজির অভিযোগে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর) দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক মজু, সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল বাসেত, ঢাকা ট্রেড সেন্টার (দক্ষিণ) দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মীর আল মামুন ও সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন রানা, ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক মনির হোসেন (টিটু), জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, শাহবাগ থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মো. জসিম উদ্দিন প্রমুখ।
সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট ও পোলট্রি পট্টি এলাকায় ফুটপাথের দোকান ও পণ্যবাহী যানবাহন থেকে চাঁদা ওঠান কয়েকজন। তাঁরা রসিদও দেন। রসিদে গুলিস্তানসহ ১৬টি স্থানে টোল আদায়ের কথা লেখা; ইজারাদারের নাম শেখ নিয়াজ মোর্শেদ, যিনি এলাকায় ‘জুম্মন’ নামে পরিচিত। তিনি বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদাবাজি করেন না; সিটি করপোরেশন থেকে তাঁর নামে কিছু এলাকার ইজারা নেওয়া আছে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন রসিদটি অবৈধ বলে জানান; ইজারার মেয়াদকাল উল্লেখ থাকে না বলে তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
অন্যদিকে নগর প্লাজা, জাকের প্লাজা, কাপ্তান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বংশাল থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. মামুন আহমেদ, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন, যুবদল নেতা রনজু প্রমুখের বিরুদ্ধে। মামুন আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর এসব এলাকা জামায়াত দখল করে রেখেছিল। আমরা উদ্ধার করেছি। তাই হকারদের দিয়ে জামায়াতের লোকজন উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার নামে এসব ছড়ায়।’ ডালিম হোসেনও অভিযোগ অস্বীকার করেন। আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করে খাই। কিছু কর্মী হয়তো আমাদের নাম করে টাকা ওঠাতে পারে। পুলিশও এদের সঙ্গে জড়িত।’
অপরাধের ঘটনা চোখের সামনেই ঘটে। গুলিস্তান এককভাবে কোনো থানার অধীনে নয়—একাংশ পল্টন, একাংশ শাহবাগ ও একাংশ বংশাল থানার আওতায়। ১০ আগস্ট জিরো পয়েন্ট এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় তাঁর কান ছিঁড়ে রক্ত ঝরছিল; ছিনতাইকারীকে ধরে মারধর করেন পথচারীরা। গত বছরের ৯ জানুয়ারি গুলিস্তানের একটি মসজিদে ইমামতির আড়ালে মাদক সিন্ডিকেট চালানোর দায়ে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৪ জুলাই রমনা ভবন মার্কেটের সামনের ফুটপাতে এক কাপড়ের দোকান কর্মচারীকে অচেতন করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। প্রকাশ্যে মাদক গ্রহণ করতে দেখা যায় তরুণ ও কিশোরদের; এমনকি ট্রাফিক পুলিশের বক্সের সামনেই।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) মোহাম্মদ ওসমান গণি প্রথম আলোকে বলেন, গুলিস্তানে অপরাধ দমনে তাঁরা সব সময় সচেষ্ট। কিন্তু অপরাধীরা জামিন পেয়ে আবার অপরাধে জড়ায়। তিনি বলেন, গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় অপরাধের পেছনে একটি আর্থসামাজিক বিষয় রয়েছে। যদি সব পক্ষকে নিয়ে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা যায় এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবু প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে গুলিস্তানে যেতে হয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে এলাকাটির গুরুত্ব অপরিসীম। ১০ আগস্ট সেখানে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের বক্সে পাওয়া গেল এক পুলিশ কর্মকর্তাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, গুলিস্তানে খুব প্রয়োজন না হলে তিনি পকেট থেকে মুঠোফোন বের করেন না; এয়ারবাড ব্যবহার করে কথা বলেন। কারণ, বের করলেই ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে পারে ছিনতাইকারীরা।
আদি ঢাকাবাসী ফোরামের সদস্যসচিব জাভেদ জাহান প্রথম আলোকে বলেন, বঙ্গভবনে চলাচলের ভিন্ন পথ রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারাও পুলিশ সদর দপ্তরে গুলিস্তান দিয়ে যান না। গুলিস্তানে সাধারণ মানুষই যায় এবং তাদের মনে অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁর মতে, ‘দেখে যদি না দেখার ভান করে, তাহলে তো কোনো কিছু ঠিক করা যায় না।’




