ফুটবল-বিশ্বে দলবদলের মৌসুম সবসময়ই উত্তাপ ছড়ায়। ক্লাবগুলো চায় সুলভে শ্রেষ্ঠ প্রতিভা কিনতে, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী— সুযোগ হাতছাড়া হলে সেই আফসোস পিছু ছাড়ে না। এমনই পাঁচজন খেলোয়াড়ের কথা উঠে এসেছে, যাদের না পাওয়ার বেদনা আজও ক্লাবগুলো বহন করছে।

সাবেক বার্সেলোনা ও ব্রাজিলিয়ান তারকা রিভালদোর গন্তব্য হতে পারত ইংল্যান্ডের বোল্টন ওয়ান্ডারার্স। ২০০৪ সালে এসি মিলানে কোণঠাসা ৩২ বছর বয়সী এই বিশ্বকাপজয়ীকে দলে টানতে বড় দাাঁ মারতে চেয়েছিলেন ম্যানেজার স্যাম অ্যালারডাইস। বোল্টনকে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন রিভালদো নিজেও। কিন্তু শেষ মূহুর্তে সিদ্ধান্ত বদলে তিনি পাড়ি জমালেন গ্রিক ক্লাব অলিম্পিয়াকোসে। অথচ সেই মৌসুমেই লিভারপুলের সমান পয়েন্ট পেয়ে লিগ টেবিলের ছয় নম্বরে থেকে উয়েফা কাপে স্থান করে নেয় বোল্টন, যারা শেষ বত্রিশ পর্যন্তও পৌঁছায়।

তবে কাকার ঘটনা আরও চমকপ্রদ। ২০০৯ সালের শুরুতেই পেট্রোডলারে সমৃদ্ধ ম্যানচেস্টার সিটি এসি মিলানকে তৎকালীন বিশ্বরে কর্ডের দ্বিগুণের বেশি—১০৮ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব দিয়েছিল ২০০৭-এর ব্যালন ডি’অর বিজয়ী এই ব্রাজিলিয়ানের জন্য। এক সমর্থক এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে বুকে খোদাই করে ফেলেছিলেন কাকার নাম। কিন্তু কাকা জানিয়েছিলেন সময়টি সঠিক নয়। মাত্র ছয় মাস পর অবশ্য ৫৬ মিলিয়নের রেকর্ড দামে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। পরে লা লিগা ও স্প্যানিশ কাপ জিতে আবার মিলানে ফেরেন, তারপর খেলেন এমএলএসের অর্লান্ডো সিটি ও সাও পাওলোতে।

১৯৯৫ সালে লি জয়ী ব্লাকবার্ন রোভার্সের প্রত্যাখ্যান ছিল আরও বেদনাদায়ক। ক্লাবের কোচিং স্টাফ মালিক জ্যাক ওয়াকারকে ফরাসি তরুণ জিনেদিন জিদান ও ক্রিস্তফ দুগারিকে কিনতে অনুরোধ করলেও ওয়াকারের উত্তর ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে: ‘টিম শেরউড থাকতে জিদান কেন লাগবে?’ জিদান-দুগারি ইংল্যান্ডে গিয়ে আলোচনাও চালিয়েছিলেন, কিন্তু চুক্তি হয়নি। তিন বছর পর জিদান ফ্রান্সকে বিশ্বাপ জেতান এবং দুই বছর পরে ইউরো শিরোপাও। ব্ল্যাকবার্ন তখন নিশ্চিতভাবে টের পেয়েছিল কী হারিয়েছিল।

২০০৫ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়ের পরই স্টিভেন জেরার্ড লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে ভক্তদের হৃদয় ভেঙে দেন। জোসে মরিনিওর চেলসি তাঁকে পেতে ৩২ মিলিয়ন পাউন্ড দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ‘পারিবারিক কারণ’ দেখিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত অ্যানফিল্ডেই থেকে যান, লাল জার্সিতে সাত শোর বেশি ম্যাচ খেলেন এবং ২০০৭ সালের ফাইনালেও দলকে নিয়ে যান। দশ বছর পর মরিনিও স্বীকার করে নেন, জেরার্ডকে দলে না পাওয়াটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় আফসোস।

তরুণ কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও পেতে আগ্রহী ছিল লিভারপুল। ২০১৭ সালে যখন তিনি মোনাকোয়, তখন রেডিরা প্রাইভেট জেট ও খাবারের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেছিল। মায়ের প্রিয় ক্লাব হওয়ায় এমবাপ্পেও আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু সর্বশেষে তিনি পিএসজিতে যোগ দেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ফুলহাম প্রিমিয়ার লিগে টিকতে রিয়াল সোসিয়েদাদের কাছে আতোয়া গ্রিজমানের জন্য ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু শেষে ওই টাকায় তারা অলিম্পিয়াকোসের মিত্রোগলুকে কেনে, যিনি মাত্র তিন ম্যাচ খেলে গোলহীন অবস্থায় দলের অবনমন দেখেন। অন্যদিকে স্পেনেই থেকে একের পর এক শিরোপা জিততে থাকেন গ্রিজমান। এই সব ঘটনা একই শিক্ষা দেয় — ফুটবল কখনই নিশ্চিততার খেলা নয়, একটি মূহুর্তের সিদ্ধান্তই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।