বিভিন্ন সংস্কৃতিতে হাসির অর্থ ভিন্ন হতে পারে, আর রাশিয়ান সমাজে এর বিশেষ ব্যাখ্যা রয়েছে। দেশটিতে ভ্রমণ করলে অনেকেই একটি পার্থক্য লক্ষ্য করেন—সেখানকার মানুষ প্রায়শই গম্ভীর থাকেন, জনসমক্ষে সহজে হাসেন না। এই স্বভাব নিছক ব্যক্তিত্বের নয়, এর মূলে রয়েছে শতাব্দীর ইতিহাস, সামাজিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব।
প্রথম যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হলো রাশিয়ায় সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে হাসি ব্যবহৃত হয় না। অনেক সমাজে বিনয় প্রকাশের সাধারণ একটি উপায় হলো মৃদু হাসি। কিন্তু রুশ সংস্কৃতিতে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। সেখানে অকারণে হাসি-খুশি থাকাকে অনেক সময় সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাদের ধারণা, যিনি সবসময় হাসছেন, তিনি হয়তো নিজের প্রকৃত অনুভূতি লুকাচ্ছেন কিংবা কোনো কিছু গোপন করছেন। তাই, অযথা হাসিকে তারা অন্তরত বলে বিবেচনা করেন না।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে কাজ করে দেশটির সমাজকাঠামো। রুশ সমাজে স্তরভেদ স্পষ্ট। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষজন একে অপরের সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় চলে। নিম্ন স্তরের কেউ যদি অনুচিতভাবে হাসাহাসি করেন, তবে তা উচ্চ শ্রেণির কাছে অগ্রহণযোগ্য ঠেকতে পারে এবং এর জন্য শাস্তিও পেতে হতে পারে। এই কঠোর সামাজিক শৃঙ্খলা মানুষকে অপ্রয়োজনীয় হাসি থেকে বিরত রাখে।
তৃতীয় পরিপ্রেক্ষি হচ্ছে পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। রাশিয়ানরা বিশেষত কোনও ব্যবসায়িক বৈঠক, আনুষ্ঠানিক আলোচনা অথবা প্রথমবার কারও সঙ্গে পরিচয় হওয়ার মুহূর্তে অতিরিক্ত হাসাহাসিকে সমীচীন মনে করে না। তাদের ধারণা, এর ফলে তারা আলোচ্য বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না অথবা বিপক্ষ ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করছে না, এমন ভ্রান্ত ধারণা জন্মাতে পারে। একই রীতি অনুসরণ করেন সরকারি কর্মচারী বা রেস্তোরাঁর কর্মীরাও। তাদের কাছে কাজের পরিবেশ পবিত্র এবং সেখানে হাসি একটি অনুপযোগী আচরণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের শৈশব থেকেই এই সামাজিক নিয়ম শিখিয়ে থাকেন।
সবশেষে, অপরিচিতদের সঙ্গে হাসাহাসি তাদের অভ্যাসের মধ্যে পড়ে না। আমরা অনেক সময় অজানা মানুষের সাথেও হাসিমুখে কথা বললেও রাশিয়ানরা তা করে না। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি যদি কোনো রাশিয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসেন, তাহলে তারা বিরক্ত হবেন না বা মুখ সরিয়ে নেবেন না; বরং তারা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে জিজ্ঞেস করতে পারে যে আপনি তাকে চিনুন কিনা। বরং বিপরীত চিত্র, যখন কোনো রাশিয়ান স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপনার সঙ্গে হাসেন, তখন বুঝতে হবে যে তারা আপনাকে সম্পূর্ণ আন্তরিক ও আপন জন ভাবতে শুরু করেছেন।
রাশিয়ায় হাসি মূলত একটি প্রকৃত সুখ ও আন্তরিক সম্পর্কের প্রতিফলন, সৌজন্যের ভণিতামাত্র নয়। সুতরাং যখন একজন রুশ ব্যক্তি কারও সাথে হাসিমুখে কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে তিনি সত্যই প্রফুল্ল আছেন এবং সে সম্পর্কটি তার কাছে অর্থবহ। মিথ্যা বা কৃত্রিম হাসিতে তারা বিশ্বাসী নয়।




