প্রকৃতির রূপ বদলের দিন মানেই ঘরবন্দি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য উন্মাদনার পরব। টিপটিপ বৃষ্টি নামলেই পাহাড়ি পথের নিভৃত কোনো জলপ্রপাতে ভিজে আসার বাসনা যেন চেপে বসে। বর্ষাকালে যে কোনো ঝরনার রূপ বর্ণনার অতীত; মনে হয় পাহাড়ের বাঁকখোলা গা বেয়ে যেন প্রিয়জনের চোখের ধারার মতো স্বচ্ছ পানি নেমে আসছে অপলক।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, যা কক্সবাজারের খুবই কাছাকাছি, সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ার সুবাদে এর জলপ্রপাতগুলো অনেকটাই অগোচরেই রয়ে গেছে। সাধারণত দর্শনার্থীরা সেখানকার লেকের মায়াবী সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে ভিড় জমান। অথচ সেই লেকের পাশ থেকেই মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের পায়ে চলা পথ পেরোলেই চোখে পড়ে বাহুবলী ঝরনার যুগল রূপ। পাশাপাশি অবস্থিত এই দুই ফলসে পৌঁছানোর আগের ট্রেইলের সৌন্দর্যও অপরূপ; জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ যেন চিরদিনের সঙ্গী হয়ে পথ চলে।
প্রথম দুটি ঝরনার পর আরও প্রায় এক ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে গন্তব্য ছিল ১ নং জালিয়াছড়ি ইউনিয়ন। সেখানে আহার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আলাপের ফাঁকে জানা গেল, আরও দুটি ঝরনা নাকি নীরবে অপেক্ষা করে আছে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য। খবরটি পেয়ে ভ্রমণকারী দলের সদস্যদের কৌতূহল দ্বিগুণ হলো। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেলেও নতুন আবিষ্কারের নেশা থামল না। লেকের সামনের একটি চায়ের দোকানে স্থানীয় জুমচাষী হ্লামাং চিং-এর সাথে সখ্য গড়ে উঠায় তিনিও দলের সাথে যোগ দিলেন। তার নিজেরও ওই পথে আগে যাওয়া হয়নি, তবে একজন স্থানীয় সঙ্গী দূরের অজানা জায়গায় মনে সাহস যোগায়।
নতুন করে ঝিরি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দলটি প্রথম পৌঁছায় সোসং ঝরনায়। স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘গোল ঝরনা’। এমন নৈসর্গিক পরিবেশে উপনীত হয়ে সকলের মন ভালোতে ভরে যায়। চোখ ফেরানো যায় না ধারার থেকে; নীরবে বৃষ্টির সাথে মিশে যেতে হয় প্রকৃতির নিরব গানের সাথে। সোসং শেষে তারা রওনা দেয় 'লম্বা ঝরনা'র দিকে, যার প্রকৃত নাম পরে জানা যায় কোয়াসং ঝরনা। এই ঝরনার রূপ বাক্যাতীত—এর বিশেষত্ব হলো ধারা নেমে আসে দুই দিক থেকে। মনে হয় বান্দরবানের গহীনে লুকিয়ে থাকা ত্লাবং ডাবল ফলসের আরেক সংস্করণ যেন এটি।
তবে এই অভিযান ছিল বেশ দুঃসাহসিক। রাস্তায় এত পরিমাণে জোঁকের কামড়ে অণ হয়েছে যা কল্পনার বাইরে। একটি জোঁক সরাতেই আরও দুইটি দেহে উঠে আসছিল। তবু সেই ক্লান্তি ও অস্বস্তি সৌন্দর্যের কাছে হার মেনেছে। এসবের পাশাপাশি ভবিষ্যতের ভ্রমণকারীদের জন্য চাকঢালায় সোনালি ঝরনা এবং আদর্শ গ্রামের ঝরনারও আকর্ষণীয় গল্প রইলো।
আরও পড়ুন: লিফটের ওঠানামায় ওজন বদলের বিজ্ঞান: ত্বরণই মূল কারণ




