সাউথ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে গত শনিবার (১৮ জুলাই) বসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এক বিশেষ মিলনমেলা। স্থানীয় বিফএকর কমিউনিটি হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোরাম অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া (DUFAA) আয়োজিত ‘ঈদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস গেট-টুগেদার’ অনুষ্ঠানে বিপুল উৎসাহ দেখা যায়। অ্যাডিলেডের বিভিন্ন শহরতলি থেকে দেড় শতাধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এতে অংশ নেন। প্রবাসে এসেও প্রিয় ক্যাম্পাসের স্মৃতি আর সতীর্থদের পুনরায় পাওয়ার আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সাউথ অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) মেগান স্পেন্সার, যিনি টরেন্স কনস্টিটিউশনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর উপস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বক্তব্যে মেগান স্পেন্সার বাংলাদেশি কমিউনিটির মেধা ও কর্মদক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের ইতিবাচক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল সংগঠনের চার বছরের পথচলায় প্রথমবারের মতো প্রকাশিত একটি উচ্চমানের ও গবেষণাধর্মী ই-ম্যাগাজিনের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন। ম্যাগাজিনটির চিফ এডিটর ড. এম ইউনুস জানান, এ সংখ্যায় প্রথিতযশা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, কবিতা ও বাস্তবধর্মী ছোটগল্প স্থান পেয়েছে। অবদানকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাডিলেড, মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি, আরএমআইটি ও ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির স্বনামধন্য অধ্যাপক ও গবেষক। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চারজন প্রবীণ অধ্যাপক এম ইকবাল, শামসুল খান, হাবিব জাফরুল্লাহ ও এম কাইয়ুম এবং ফ্লিন্ডার্স ও অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির ড. এম ইউনুসের লেখা ম্যাগাজিনটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রকাশনায় অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আধুনিক শিক্ষাকাঠামো ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার পথে বাধা এবং যৌথ ডিগ্রি ও গবেষণা অংশীদারিত্ব চালুর ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক সংকট নিয়ে তাত্ত্বিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাগত বক্তব্যে ডুফার সভাপতি এম ইউনুস বলেন, ‘১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত আমাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসময় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলা হতো। সত্যেন বোস থেকে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মতো হাজারো ক্ষণজন্মা মানুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সৃষ্টি। সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় এই অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দিতে পারা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘২০২২ সালে ডুফা প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা চারটি বার্ষিক পুনর্মিলনী, ঈদ পুনর্মিলনী, ইফতার ও পিকনিক সফলভাবে আয়োজন করেছি। এই ই-ম্যাগাজিন আমরা সামাজিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেব, যাতে সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় আসা নতুন শিক্ষার্থী ও অভিবাসীরা সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেন।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আজমির হোসেন বিগত চার বছরের অর্জন ও সাংগঠনিক অগ্রযাত্রা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘ডুফা কেবল একটি প্রথাগত সংগঠন নয়, এটি অ্যাডিলেডে আমাদের একটি নিবিড় পারিবারিক বন্ধন। ২০২২ সালে থেবার্টন কমিউনিটি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন থেকে শুরু করে প্রতিবছর শিক্ষা, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজসেবায় অনন্য অবদানের জন্য “সার্টিফিকেট অব এক্সিলেন্স” প্রদানের মাধ্যমে আমরা প্রাক্তনের মেধাকে মূল্যায়ন করে আসছি।’ তিনি অনুষ্ঠান সফল করতে কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি তারিক আনজাম, কোষাধ্যক্ষ জালাল, সহ-কোষাধ্যক্ষ ইফতেখারুল আলম, সহ-যুগ্ম সম্পাদক ড. আসিফসহ সব সাধারণ সদস্য ও তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে প্রায় ১৭০ জন অ্যালামনাই ও তাঁদের পরিবারের সদস্য উপস্থিত ছিলেন, যাদের বেশিরভাগই নবীন। ড. আসিফ ও আরমান অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। সমাপনী পর্বে ঘোষণা করা হয় যে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে অ্যাডিলেডে আরও বড় পরিসরে সংগঠনের ‘পঞ্চম বার্ষিক পুনর্মিলনী’ অনুষ্ঠিত হবে। আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের গান, কবিতা আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণায় বিফএকর কমিউনিটি হলটি যেন ক্ষণিকের জন্য কার্জন হল, টিএসসি কিংবা মল চত্বরের সেই চেনা আড্ডার দিনগুলোর মতো মুখরিত হয়ে ওঠে।




