আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাব আরও জোরদার হওয়ায় আগামী কয়েক সপ্তাহে এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার ছয়টি দেশ বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ, খরা এবং সংক্রামক রোগের মুখোমুখি হতে পারে। সংস্থাটি গতকাল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের লাখো মানুষ।
বর্তমানে বাংলাদেশে চলতি মৌসুমি বৃষ্টিতে ইতিমধ্যে প্রাণহানি ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। আইআরসির তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় ভূমিধস ও বন্যায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। জুলাই মাসের শুরু থেকে ১০ হাজারের বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়েছেন। সংস্থাটির মতে, এল নিনোর কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় আবহাওয়ার বৈরিতা আরও বাড়তে পারে, ফলে বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের শঙ্কা কাটছে না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানে গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে।
পূর্ব আফ্রিকার পরিস্থিতি আরও জটিল বলে উল্লেখ করেছে আইআরসি। সোমালিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গড়ের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘ খরা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে দেশটিতে বর্তমানে ৪৮ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ২০২৩ সালের বন্যায় সোমালিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছিল এবং বহু শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার একই ধরনের বন্যা হলে ক্ষয়ক্ষতি আরও ব্যাপক হতে পারে, কারণ মানুষ ইতিমধ্যে খরা ও সহায়তা হ্রাসের কারণে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ইথিওপিয়ার উঁচু এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও সোমালিয়ার দেইর মৌসুমের বৃষ্টির কারণে দেশটির প্রধান দুই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা ও তীব্র পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
কেনিয়ায় জানুয়ারি থেকে জুন মাসজুড়ে এল নিনো পরিস্থিতি বিরাজ করছে—এমনটাই পূর্বাভাস। দেশটির সরকার ইতিমধ্যে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা কাঠামো সক্রিয় করেছে। উগান্ডাতেও বছরের শেষ প্রান্তিকে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। আগের এল নিনো চক্রে দেশটিতে ৪ লাখ ১৩ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। আইআরসির জরুরি কার্যক্রমবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট বব কিচেন বলেন, “একই সময়ে একাধিক সংকট তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠী এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্যোগ শুরুর আগেই ব্যবস্থা নেওয়া পরে সহায়তা দেওয়ার চেয়ে অনেক কম ব্যয়বহুল এবং বেশি মানবিক।”
এল নিনোর প্রভাব আরও জোরালো হওয়ায় আইআরসি দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারের প্রতি পূর্ব আফ্রিকা ও এশিয়ায় এখনই আগাম প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার আগে নগদ সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি ও সতর্কবার্তা পৌঁছে দিলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টির কারণ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাসের প্রথম ১১ দিনেই মোট বৃষ্টির ৭৫ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, নিম্নচাপের পাশাপাশি মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় অবস্থান এবং এল নিনোর বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার কারণে এমন বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ জানান, নিম্নচাপ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়ে স্বাভাবিক পথ না ধরে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলমুখী হওয়ায় চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এল নিনোর কারণে অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবারের বৃষ্টিতে দেশের এক লাখ হেক্টরের বেশি ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে।




