স্কটল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সিকার পয়েন্টে সম্প্রতি খোলা হয়েছে ‘ডিপ টাইম ট্রেইল’ নামে একটি নতুন পথ। স্কটিশ ভূতত্ত্ববিদ জেমস হাটনের ৩০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তৈরি এই ট্রেইলটি বেরউইকশায়ারের খাড়া উপকূল বরাবর প্রায় এক মাইল দীর্ঘ। দর্শনার্থীরা এখানে হেঁটে পৌঁছাতে পারেন সেই ঐতিহাসিক শিলাস্তরে, যেখানে হাটন পৃথিবীর বয়স সম্পর্কে তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ খুঁজে পেয়েছিলেন।

১৭৮৮ সালে সিকার পয়েন্ট প্রথম দেখার আগেই হাটন তাঁর তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন যে, ক্ষয় ও পুনর্গঠনের চক্রের মাধ্যমে পৃথিবীপৃষ্ঠ গঠিত হয়েছে। তবে এই স্থানটিই তাঁকে সেই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় দৃশ্যমান প্রমাণ এনে দেয়। এখানে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন গ্রেওয়াকি শিলার ওপর অপেক্ষাকৃত নবীন আনুভূমিক লাল বেলে পাথরের স্তর রয়েছে। এই স্তরবিন্যাস পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিশাল সময়ের ব্যবধান প্রকাশ করে, যা তৎকালীন ১৮শ শতকের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিল না। এখন এই বিশাল ভূতাত্ত্বিক সময়কে ‘ডিপ টাইম’ বলা হয়।

ট্রেইলটি পিজ বে–এর কাছ থেকে শুরু হয়ে খাড়া উপকূল ধরে এগিয়ে গেছে। পথে হাটনের লেখনী খোদাই করা পাথর এবং ব্যাখ্যামূলক তথ্যফলক রয়েছে, যেগুলো থেকে বিশেষজ্ঞদের অডিও ভাষ্য শোনা যায়। অডিও ভাষ্যের শুরুতে বিজ্ঞানী ও স্কটিশ জিওলজি ট্রাস্টের সাবেক চেয়ার ড. এলসা পানচিরোলি দর্শনার্থীদের স্বাগত জানিয়ে হাটন ও সিকার পয়েন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ট্রেইলের শেষ দিকে একটি অর্ধবৃত্তাকার দর্শনস্থল রয়েছে, যেখান থেকে নিচের শিলাস্তর পরিষ্কার দেখা যায়। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কীভাবে এই শিলাগুলো পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছে।

হাটন তাঁর গবেষণায় পর্যবেক্ষণনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, যা সে সময় অস্বাভাবিক ছিল। তিনি কাছাকাছি থাকা তাঁর দুটি খামারকে কর্মশালাভিত্তিক গবেষণাগারে পরিণত করেন এবং ধীরে ধীরে চক্রাকারে মাটি ক্ষয় ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতেন। স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করলেও সিকার পয়েন্টই তাঁর তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে। গ্রেওয়াকি শিলাগুলো সাড়ে ৪৩ কোটি বছর আগে একটি প্রাচীন মহাসাগরের তলদেশে তৈরি হয়েছিল। ভূগাঠনিক প্লেটের সংঘর্ষ ও সেই মহাসাগর বিলীন হওয়ার সময় এগুলো ওপরের দিকে উঠে একটি পর্বতমালা তৈরি করেছিল। বর্তমানে যা অবশিষ্ট, তা সেই পর্বতমালার ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ। ওপরের বেলেপাথর তৈরি হয়েছিল আরও সাড়ে ছয় কোটি বছর পরে, যখন বর্তমান স্কটল্যান্ড নিরক্ষরেখার দক্ষিণে অবস্থিত ছিল।

পথে সেন্ট হেলেনস কার্ক গির্জাও দেখা যায়। লাল বেলে পাথরে নির্মিত এই গির্জাটি ২৩৮ বছর আগে হাটন যখন এখানে এসেছিলেন, তখনই প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় ছিল। গির্জার চারপাশে গ্রেওয়াকি দিয়ে তৈরি পাথরের উঁচু দেয়াল রয়েছে। আরও সামনে একটি খাঁজকাটা পাথরের ডাইক দর্শনার্থীদের একটি বেঞ্চের কাছে নিয়ে যায়, যেখানে বসে পূর্ব উপকূলের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। উপকূল বরাবর ঢেউ খেলানো সবুজ পাহাড় ও কৃষিজমি বর্ডারল্যান্ডের খাড়া উপকূলের দিকে নেমে গেছে, আর সেখান থেকে খাড়া ঢাল নেমে গেছে সোনালি সৈকত ও নির্জন ছোট ছোট উপসাগরে।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের হান্টেরিয়ানের ভূতত্ত্ব বিভাগের কিউরেটর কেটি স্ট্র্যাং বলেন, তিনি আইমাউথে হাইস্কুলে পড়লেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগপর্যন্ত সিকার পয়েন্ট সম্পর্কে জানতেন না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন ট্রেইল এমন মানুষদেরও সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি করবে, যারা হয়তো কখনো ভূতত্ত্বের কোনো ট্রেইলে হাঁটার কথা ভাবেননি। লেখক ও সাংবাদিক স্টুয়ার্ট কেনি, যিনি সম্প্রতি ট্রেইলটি ঘুরে এসেছেন, বলেন, সিকার পয়েন্টের দিকে তাকিয়ে তিনি বিশালতার অনুভূতি পান। কয়েক শ মিলিয়ন বছরের পুরোনো শিলার ওপর দাঁড়িয়ে সহজেই বোঝা যায়, কেন এই ভূদৃশ্য বিজ্ঞানের অন্যতম বড় অগ্রগতির অনুপ্রেরণা হয়েছিল।

হাটন তাঁর ‘থিওরি অব দ্য আর্থ’ বইয়ের উপসংহারে সিকার পয়েন্ট সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সেখানে শুরুর কোনো চিহ্ন যেমন নেই, শেষেরও কোনো সম্ভাবনা নেই।’ ভূতত্ত্বকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তৈরি এই ট্রেইল এখন আন্তর্জাতিক তীর্থস্থান সিকার পয়েন্টকে সাধারণ মানুষের জন্যও সহজলভ্য করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।