রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একসময় নিয়মিত শোনা যেত এক ছোট প্যাঁচার ডাক। পাখিপ্রেমীদের অনেকেই সেই ডাক রেকর্ড করেছেন, কেউ কেউ এর ছবিও তুলেছেন। বাংলাদেশে এই প্রজাতির আগে কোনো দৃষ্টান্ত না থাকায় বাংলায় এর কোনো প্রচলিত নাম ছিল না। রাজশাহীতে আবিষ্কারের পর এটি ‘জাঙ্গল আউলেট’, ‘জঙ্গল প্যাঁচা’ বা ‘ছোট কালিপ্যাঁচা’ নামে পরিচিতি পায়। কিন্তু হঠাৎ করেই পাখিটি ক্যাম্পাস থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও আর এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি অন্য কোনো স্থানে চলে গেছে, নাকি প্রাণ হারিয়েছে—তা নিয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
তবে আশার খবর, চলতি বছরের মে মাসে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দুটি ছোট কালিপ্যাঁচার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। রাজশাহীর পাখিপ্রেমী নাইমুল হাসান এই জোড়া পাখির ছবি তুলেছেন। ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে এই পাখিগুলোকে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে প্যাঁচাটি ছিল, সেটি একাকী ছিল এবং তার কোনো সঙ্গী ছিল না।
পাখিটির প্রথম আবিষ্কারের কাহিনী ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে শুরু। সেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এ এম সালেহ রেজা প্যারিস রোড এলাকায় একটি অপরিচিত পাখির ডাক শুনতে পান। ডাকের উৎস খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখেন, একটি আমগাছ থেকে উড়ে পাশের গগনশিরীষ গাছে বসেছে একটি প্যাঁচা। প্রথমে তিনি মনে করেছিলেন এটি খুঁড়লে-প্যাঁচা, কারণ ক্যাম্পাসে এই প্রজাতি নিয়মিত দেখা যায়। তাই তেমন গুরুত্ব না দিয়ে কয়েকটি ছবি তোলেন তিনি।
বাসায় ফিরে কম্পিউটারের পর্দায় ছবি বড় করে দেখে তাঁর ধারণা বদলে যায়। পাখিটির আকার ছোট, পিঠ লালচে বাদামি, গায়ে সূক্ষ্ম ডোরাকাটা দাগ, চোখ উজ্জ্বল হলুদ এবং পা হলুদাভ। বইয়ের ছবির সাথে মিলিয়ে তিনি সন্দেহ করেন, এটি জাঙ্গল আউলেট হতে পারে। বাংলাদেশের পাখির তালিকায় তখন এই প্রজাতির নাম ছিল না। তাই সালেহ রেজা ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। সেখানে কেউ একে জাঙ্গল আউলেট, কেউ খুঁড়লে-প্যাঁচা বলে চিহ্নিত করেন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনিরুল খান এটি জাঙ্গল আউলেট বলে মত দেন। পাখিদর্শক পল থমসন ও সায়েম চৌধুরী পাখিটির পিঠের ছবি ও ডাকের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেন, এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি প্রজাতি—জাঙ্গল আউলেট।
এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাখি গবেষক ও দর্শকরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে আসেন এই বিরল প্যাঁচা দেখতে ও ছবি তুলতে। গত ২৪ জুন ক্যাম্পাসে অধ্যাপক সালেহ রেজার সাথে কথা হলে তিনি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে পাখির আবাসস্থল দেখান। ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের কাছে একটি দেওয়ালের ছোট কোটরে থাকা লক্ষ্মীপ্যাঁচাও দেখান। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের দুরবিনে স্পষ্ট দেখা যায়, কোটরের ভেতরে একটি লক্ষ্মীপ্যাঁচা নিশ্চিন্তে বসে আছে।
কথোপকথনের ফাঁকে সালেহ রেজা জানান, গত বছরের এপ্রিলের পর থেকে তিনি আর ছোট কালিপ্যাঁচাটির ডাক শোনেননি বা দেখতেও পাননি। তাঁর মতে, পাখিটি হয়তো অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হয়েছে, অথবা মারা যাওয়াও সম্ভব। নিশাচর পাখিদের নানা ধরনের প্রাকৃতিক শত্রু থাকে। পঞ্চগড়ে নতুন করে জোড়া প্যাঁচা দেখা গেলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই একাকী পাখিটি আর কোনো ডাক দেয় না বা দৃষ্টিগোচর হয় না।




