জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সৌরজগতের বাইরে কোনো উপগ্রহ বা এক্সোমুনের সন্ধান করছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারেরও বেশি এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহ আবিষ্কৃত হলেও, কোনো চাঁদের স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। তবে সম্প্রতি বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, সম্ভবত সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে সিডি-৩৫ ২৭২২ নামক একটি তারা পর্যবেক্ষণের সময় বিজ্ঞানীরা একটি অস্বাভাবিক বস্তুর সন্ধান পান। এ কাজে চিলির ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ ব্যবহৃত হয়। যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে এই আবিষ্কার, তার ভর আমাদের সূর্যের প্রায় অর্ধেক। গবেষণা বলছে, এই তারাটিকে প্রদক্ষিণ করছে একটি বাদামি বামন বা ব্রাউন ডার্ফ। এগুলোকে ‘ব্যর্থ তারা’ বলা হয়, কারণ এরা নক্ষত্রের মতো গঠিত হলেও কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার সংযোজন প্রক্রিয়া শুরু করার মতো পর্যাপ্ত ভর অর্জন করতে পারে না। সাধারণত বৃহস্পতির তুলনায় এদের ভর ১৩ থেকে ৮০ গুণ বেশি হয়।

কিন্তু আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তনরত বাদামি বামনটির চারপাশে। একটি নতুন বস্তু সরাসরি নক্ষত্রকে নয়, বরং ঘুরছে ওই বাদামি বামনকে কেন্দ্র করেই। আমাদের সৌরজগতের উপগ্রহগুলো যেমন গ্রহের চারদিকে ঘোরে এবং গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, এটিও ঠিক সেভাবেই নক্ষত্রের পরিক্রমরত একটি বস্তুর উপগ্রহ হিসেবে অবস্থান করছে।

চিলির ডিয়েগো পোর্তালেস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী কেভিন হয় ব্যাখা করেন, এই বস্তুকে চাঁদ বা গ্রহ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা কঠিন। এর আকার ও ভর এত বেশি যে এটি অনায়াসেই একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রহের স্বীকৃতি পেতে পারে। কিন্তু এটি সরাসরি কোনো নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে না, বরং অন্য একটি নক্ষত্রসদৃশ বস্তুর কক্ষপথে রয়েছে। অপর গবেষক অ্যালিস জুরলো বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, আমাদের নিজেস সৌরজগতে নক্ষত্র আর গ্রহের তফাত ধরা সহজ হলেও, এত দূরের সিস্টেমে নক্ষত্র, গ্রহ আর চাঁদের মধ্যকার সীমানাটি আবছা ও অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। এই কারণেই বিজ্ঞানী সম্প্রদায় একে সরাসরি ‘এক্সোমুন’ না বলে আরও ব্যাপক অর্থে ‘এক্সোস্যাটেলাইট’ (বহিরূপগ্রহ) নামে অভিহিত করছেন।

আমাদের সৌরজগতের প্রায় প্রতিটি গ্রহেরই একাধিক প্রাকৃতিক চাঁদ রয়েছে। তাই হাজারের বেশি এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হলেও কোনো উপগ্রহ না পাওয়া ছিল একটি বড় রহস্য। কারণ, শত শত আলোকবর্ষ দূরে ক্ষুদ্র ও ক্ষীণ আলোর কোনো উপগ্রহ শনাক্ত করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল ও দুরুহ ব্যাপার। তবে বিজ্ঞানীরা প্রত্যাশা করছেন যে, বর্তমানে চিলিতে নির্মাণাধীন এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপটি সম্পূর্ণ চালু হলে এটি আরও সংবেদনশীল তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতে পারবে। এর ফলে এই রহস্যময় এক্সোস্যাটেলাইটগুলো এবং প্রকৃত এক্সোমুনগুলোর প্রকৃতি উন্মোচন করা সহজতর হবে। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া