বর্তমান যুগে লিথিয়াম প্রযুক্তিজগতের একটি অনিবার্য উপাদান। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মহাকাশযানের যন্ত্রাংশ–সর্বত্রই লিথিয়ামের উপস্থিতি রয়েছে। ধাতুটির হালকা, প্রতিক্রিয়াশীল ও উচ্চ শক্তি সঞ্চয়ক্ষমতা একে বিশ্বের অন্যতম দামি মৌলে পরিণত করেছে। 'সাদা সোনা' নামে পরিচিত এই মৌলকে ঘিরে বড় বড় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
লিথিয়ামের যাত্রা শুরু হয় ১৯ শতকের প্রথম দিকে। ব্রাজিলীয় বিজ্ঞানী হোসে বনিফাসিও দে আন্দ্রাদা সুইডেনের উতো দ্বীপ থেকে পেটালাইট নামের একটি ফ্যাকাশে আকরিক সংগ্রহ করেন। সুইডিশ রসায়নবিদ জোহান অগাস্ট আরফওয়েডসন ১৮১৭ সালে ওই আকরিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন ক্ষারীয় মৌল চিহ্নিত করেন। গ্রিক শব্দ 'লিথোস' (পাথর) অনুসারে এর নাম হয় লিথিয়াম। আর ১৮২১ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম থমাস ব্র্যান্ডে তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে খাঁটি লিথিয়াম প্রস্তুত করেন।
লিথিয়ামের ভৌত বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত স্বতন্ত্র। ঘনত্ব পানির অর্ধেকেরও কম বলে এটি পানিতে ভেসে থাকে। সাধারণ তাপমাত্রায় এত নরম যে ছুরি দিয়ে কাটা যায়, কিন্তু বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে তাৎক্ষণিকভাবে এর রুপালি আভা কালো হয়ে যায়। পানির সংস্পর্শে ধীরে ধীরে বিক্রিয়া ঘটে, যা বড় টুকরোর ক্ষেত্রে আগুনের সৃষ্টি করতে পারে। এসব কারণে প্রকৃতিতে খাঁটি অবস্থায় লিথিয়াম পাওয়া যায় না; গবেষণাগারে তা সর্বদা তেলে ডুবিয়ে রাখতে হয়।
লিথিয়ামের সবচেয়ে বড় ব্যবহার লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে। ২০১৯ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী জন গুডএনাফ, স্ট্যানলি হুইটিংহ্যাম ও আকিরা ইয়োশিনো এই প্রযুক্তির মূল কারিগর। হালকা ওজনে প্রচুর বৈদ্যুতিক শক্তি জমা রাখার ক্ষমতার কারণে ব্যাটারিশিল্পে লিথিয়ামের বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিশেষ ধরনের কাচ, সিরামিক, অ্যালুমিনিয়ামের হালকা সংকর ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে লিথিয়াম ব্যবহৃত হয়। অ্যাপোলো অভিযানের সময় মহাকাশচারীদের বায়ু শুদ্ধিতেও লিথিয়াম হাইড্রোক্সাইড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে লিথিয়ামের ব্যবহার দ্বিতীয় শতকের। রোমান চিকিৎসক ইফেসাসের সোরানাস লক্ষ্য করেছিলেন, নির্দিষ্ট ঝরনার পানি মানসিক রোগীদের শান্ত করে। পরবর্তীতে অস্ট্রেলীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন কেড গিনিপিগের পরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণ করেন, লিথিয়াম বাইপোলার ডিসঅর্ডারে কার্যকর। তিনি নিজের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তবে অতিরিক্ত মাত্রা প্রাণঘাতী হতে পারে, তাই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার জরুরি।
একসময় লিথিয়াম লবণ কোমল পানীয়তেও মেশানো হতো। ১৯২৯ সালে চালু হওয়া সেভেন-আপে লিথিয়াম সাইট্রেট যুক্ত ছিল বলে এর নাম ছিল 'বিব-লেবেল লিথিয়েটেড লেমন-লাইম সোডা'। ১৯৪৮ সালে মার্কিন বিরাটি নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত সাধারণ মানুষ লিথিয়ামযুক্ত এই পানীয় সেবন করেছে। নামকরণের কারণ হিসাবে লিথিয়ামের ভর সংখ্যা ৭–এর ভূমিকাও রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
লিথিয়ামের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগও বাড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকার লিথিয়াম ত্রিভুজে প্রতি টন লিথিয়াম আহরণে ব্যাপক পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি বাষ্পীভূত করা হয়, যা স্থানীয় পানি সংকট ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে। অন্যদিকে, ব্যবহৃত লিথিয়াম ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার অপ্রতুল, যার কারণে মাটি ও পানি দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা পুরোনো ব্যাটারি রিসাইকেলের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন, যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদাও মেটানো যায়।




