বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রবণতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় উল্লেখজনক হারে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে শিক্ষাখাতে বিদেশে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে মোট ৮৮ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ধরে) ১০ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার সমতুল্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বৈদেশিক অর্থের চাহিদা ছিলো ৪৩ কোটি ২ লাখ ডলার। পরবর্তী বছরগুলোতে এ ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যায়: ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। তবে সবচেয়ে বড় লাফ দেখা যায় শেষ দুই অর্থবছরে; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খরচ ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ ডলারে উন্নীত হয় এবং সর্বশেষ বছরে এসে তা দাঁড়ায় ৮৮ কোটি ১০ লাখ ডলারেরও বেশি। অর্থাৎ, গত পাঁচ বছরে এই ব্যয় প্রায় ১০৫ শতাংশ বেড়েছে। এই অর্থ মূলত টিউশন ফি, থাকার জায়গার ভাড়া এবং জীবন যাপনের বিভিন্ন খরচ মেটাতে বিদেশে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিদেশ গমন করছেন, তবে কেউ কেউ মাধ্যমিক স্তরেও পাড়ি দিচ্ছেন। একসময় কেবল মেধাবীরাই বৃত্তি নিয়ে পড়তে যেতেন, কিন্তু বর্তমানে অভিভাবকরা সন্তানদের উচ্চশিক্ষার খরচ নিজেরাই বহন করছেন। গন্তব্যের তালিকায়ও এসেছে বৈচিত্র্য। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, 'আমাদের দেশের শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নতি ঘটলেও গুণগত মানের বিস্তৃতি ঘটেনি। শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র তৈরি না হওয়ার ফলে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। এ কারণেই অভিভাবকরা মানসম্মত শিক্ষার লক্ষ্যে সন্তানদের বিদেশে পাঠাচ্ছেন।' তিনি আরও বলেন, 'এটি একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণ, অন্যদিকে দেশীয় মানের দুর্বলতার পরিচায়ক। এই পরিস্থিতি সহজে পরিবর্তন হবে না। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন করে এর সঙ্গে কর্মের যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমে আসে।'

বিদেশে অধ্যয়নের জন্য অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য 'স্টুডেন্ট ফাইল' নামের বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রচলন রয়েছে। একটি বৈধ অফার লেটার নিয়ে ব্যাংকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে এই অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে, একবারে মাত্র একটি সেমিস্টারের ব্যয় নির্বাহের অনুমতি মেলে; সেমিস্টার শেষে পরবর্তী স্তরে উন্নীত হওয়ার প্রমাণ দাখিল করলে তবেই আবার অর্থ প্রেরণ করা যায়। জীবনধারণের খরচ হিসেবে একটি নির্ধারিত পরিমাণ নিয়মিত পাঠানো সম্ভব। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ডও প্রদান করা হয়।

এ ধরনের সেবাদানকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের বিশেষ বিভাগ 'আগামী'-র উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহরুবা রেজা জানান, 'আমাদের ৩৭টি শাখা এবং ঢাকার তিনটি বিশেষায়িত কেন্দ্রের মাধ্যমে এই সেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতি মাসে আমরা ২,০০০ থেকে ২,৫০০টি হিসাব খুলছি। ঢাকার বাইরে সিলেট ও চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী। সম্প্রতি জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।' একই সুরে সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপক অরূপ হায়দার মন্তব্য করেন, 'প্রতি মাসে আমরা ৮০০ থেকে ১,০০০ স্টুডেন্ট ফাইল খুলছি। এক সময় ইউরোপ ও আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ফাইল খোলার প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।' প্রসঙ্গত, প্রিমিয়ার ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোও এই সেবা দিয়ে আসছে।

একটি স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে আবেদনকারীর ছবি, নাম, কোর্সের সময়সীমা সম্বলিত বৈদেশিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফার লেটার, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ভিসার অনুলিপি এবং অভিভাবকের তথ্য ও পাসপোর্টের কপি জমা দেওয়া লাগে। খেয়ালনযোগ্যভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রায় কোর্স ফি প্রেরণের প্রক্রিয়া আরও সরলীকৃত করেছে, যার জন্য এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতির প্রয়োজন পড়ে না। এই সেবার জন্য ব্যাংকভেদে ন্যূনতম ফি নির্ধারিত রয়েছে, যা সাধারণত ১০ হাজার টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।