চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সাইব্লিটজ ২.০’ শীর্ষক একটি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন উৎসব। আইইইই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের আয়োজনে দুই দিনব্যাপী এই কার্যক্রমের দ্বিতীয় দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘থ্রি মিনিট থিসিস’ প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে এতে প্রতিযোগীদের হাতে ছিল মাত্র ১৮০ সেকেন্ড সময়। একটি স্থির চিত্র বা পোস্টারের সাহায্যে তাঁদের গবেষণার সমস্যা, পদ্ধতি, ফলাফল ও সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরতে হয়েছে। ভিডিও বা একাধিক স্লাইড ব্যবহারের অনুমতি না থাকায় জটিল গবেষণাকে সহজ ভাষায় সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতা পরীক্ষা করা হয় এই পর্বে।

বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তীব্র পাল এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও জলাবদ্ধতার তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব আগাম শনাক্ত করার একটি গবেষণার ধারণা প্রদর্শন করেন। শুধু ডেঙ্গুই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল তথ্য তৈরির প্রবণতা হ্রাস, স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ, ব্লকচেইনভিত্তিক নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা ও দুর্যোগে ড্রোনের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের মতো বিভিন্ন গবেষণার চিত্র ফুটে ওঠে এই প্রতিযোগিতায়। একদল শিক্ষার্থী এআইয়ের ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ভুল তথ্য সৃষ্টির সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। প্রায় ২৮ হাজার পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখিয়েছেন যে উন্নত নির্দেশনা ব্যবহার করলে এআইয়ের ভুল তথ্য দেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আরেকটি গবেষণায় মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কম্পিউটার প্রসেসরের গতি ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। স্বাস্থ্যসেবা খাতে মাইক্রোনিডল প্রযুক্তিভিত্তিক একটি বুদ্ধিমান ইনসুলিন প্যাচ উপস্থাপন করা হয়, যা রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন সরবরাহ করতে সক্ষম। এ ছাড়া ‘সেলফ-হিলিং’ উপাদান, ব্লকচেইননির্ভর ‘সেইফপাস’ এবং ড্রোননির্ভর ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার মতো গবেষণাও দর্শকদের নজর কাড়ে।

প্রথম দিন সকাল ৯টায় হ্যাকাথন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উৎসব শুরু হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান তৈরির চ্যালেঞ্জে অংশ নেন প্রতিযোগীরা। কেউ স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, কেউ পরিবেশ কিংবা নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় স্টেমভিত্তিক বানান প্রতিযোগিতা ‘স্টেম বি’, যেখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের জটিল শব্দের বানান, উচ্চারণ ও ধারণা যাচাই করা হয়। এরপর শুরু হয় প্রজেক্ট শোকেস প্রতিযোগিতা; সারি সারি টেবিলজুড়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত প্রকল্প সাজানো ছিল। বিচারকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের গবেষণা ও পরিশ্রমের গল্প বর্ণনা করেন। দর্শনার্থীরাও আগ্রহ নিয়ে প্রকল্পগুলো ঘুরে দেখেন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, টেলিযোগাযোগ, স্মার্ট অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য বিশেষ স্পিকার সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আমরার্ক লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিসু পার্ক, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফায়াত আজিজ চৌধুরী, রবি আজিয়াটা পিএলসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (কোর অপারেশনস) মোহাম্মদ আব্দুস সবুর শান্ত, ট্রমা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. রিভু রাজ চক্রবর্তী, সিমেন্স বাংলাদেশের ম্যানেজার মিঠু কুমার ভৌমিক, ই-সফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হাসান অপু এবং লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রিন্সিপাল বিজনেস কনসালট্যান্ট ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার ওমর ফারহান খান বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া আয়োজনের অংশ হিসেবে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সেশন ‘এসপিএএক্স’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি খাতের চাহিদা ও দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন সিমেন্স বাংলাদেশের আঞ্চলিক প্রধান ইরফান বিন আমদাদ চৌধুরী এবং ব্র্যাক আইটি সার্ভিসেসের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মো. মিনহাজুল আবেদীন।

আয়োজনের শেষ দিনে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়। থ্রি মিনিট থিসিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে টিম এম্বার, আর রানারআপ হয়েছে টিম জায়রিজ। হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন টিম ফৌরমাইন্ডস, রানারআপ টিম সাস। প্রজেক্ট শোকেসে চ্যাম্পিয়ন সিনক রোবোটিকস, আর রানারআপ টিম জিরো নেক্সট জেন।

উৎসবে অংশ নেওয়া আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুদ বলেন, এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এবং আয়োজনটি ছিল সুসংহত। চুয়েট আইইইই স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের সভাপতি মো. ইনজামাম উল হক সিয়াম বলেন, গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য। শুধু চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নয়, গবেষণার ধারণা আছে এমন সবাইকে সুযোগ দেওয়ার জন্যই এই আয়োজন।

প্রসঙ্গত, বিভিন্ন সেগমেন্টে সরাসরি অংশ নিয়েছেন দেশের ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী। আয়োজনের টাইটেল স্পনসর ছিল শীস্টেম, গোল্ড স্পনসর মেঘনা গ্রুপ এবং সহযোগিতায় ছিল প্রথম আলো।