যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়লেও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানীয় দক্ষতা উদ্বেগজনক হারে কমছে। সম্প্রতি ফরচুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তিকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। কলেজ বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশেরও বেশি হাইস্কুল শিক্ষার্থী লেখাপড়ার কাজে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য উত্তর খোঁজা এখন মোবাইল ফোনে প্রশ্ন টাইপ করার মতো সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু এই সহজলভ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদেরা। তাদের মতে, শেখার প্রক্রিয়ায় এআই সহায়ক নয় বরং বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জানুয়ারির এক গবেষণায় এআই-এর ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ৫০টি দেশের ৫০০ শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার এবং ৪০০টির বেশি গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রে জেনারেটিভ এআইয়ের ক্ষতিই বর্তমানে বেশি। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাইক্রোসফটের এক গবেষণায়ও দেখা গেছে, এআই ব্যবহারের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিচারক্ষমতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার দুর্বলতার সম্পর্ক রয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে স্নায়ুবিজ্ঞানী জ্যারেড কুনি হরভাথ সতর্ক করে বলেন, জেন জি-ই আধুনিক ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম যারা বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতায় নিজেদের পিতামাতার চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষা জরিপের তথ্য উল্লেখ করে দেখান, স্কুলে স্ক্রিন টাইম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার স্কোর কমছে। ২০১৪ সালে ৩ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, তারা স্ক্রিনে সময়ের দুই-তৃতীয়াংশ অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করছে।
শিক্ষার ইতিহাসে অটোমেটেড লার্নিংয়ের ব্যর্থতার নজির রয়েছে বলে মন্তব্য করেন হরভাথ। ১৯২৪ সালে ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সিডনি প্রেসি যে 'টিচিং মেশিন' তৈরি করেছিলেন, তাতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও যন্ত্রের বাইরে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারত না। তিনি বলেন, বর্তমান এআই টুলগুলোর ব্যবহারও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি করছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা টুলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং নিজস্ব চিন্তাশক্তি গড়ে তুলতে পারছে না।
এদিকে, স্কুলগুলোতে এআই ব্যবহার নিয়ে এখনো স্পষ্ট নীতি নেই। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে জরিপকৃত স্কুল পেশাদারদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম এআই ব্যবহারের জন্য নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করেছে। শিক্ষাবিদ মেরি বার্নসের মতে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দাবি করলেও এআই বর্তমানে শিক্ষাকে ব্যক্তিগতকরণের পরিবর্তে ব্যক্তিকরণ করছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব গতিতে শিখলেও জ্ঞানকে সংশ্লেষণ করতে পারছে না।
তবে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি পুরোপুরি বর্জন করাও সমাধান নয় বলে মনে করেন বার্নস। ইংরেজি ভাষা শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকরা এআই ব্যবহার করে পড়ার স্তর সহজ থেকে কঠিনে পরিবর্তন করতে পারেন। ব্রুকিংস গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের প্রতারণার আশঙ্কা থাকলেও শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনায় এআই ব্যবহার করছেন। বার্নসের ভাষ্যমতে, 'প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ব্যর্থ, বলা ঠিক হবে না, তবে এটি মিশ্র ফলাফল দিচ্ছে, এটাই বাস্তবতা।'
সবমিলিয়ে, শিক্ষাক্ষেত্রে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তি যাতে শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে প্রকৃত সহায়ক হয় এবং তাদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিকে নষ্ট না করে, সেদিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।




