আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দেশের জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড টুয়েলভ রাঙামাটিতে আয়োজন করেছে ব্যতিক্রমী এক ফটোশুট। স্টুডিওর কৃত্রিম সাজসজ্জার বদলে পাহাড়ের সবুজ, কাপ্তাই হ্রদের নীল জল আর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক আলোর মাঝে স্থানীয় আদিবাসী তরুণ-তরুণীরা ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন তাঁদের সমকালীন পোশাকে। এ আয়োজনের মাধ্যমে কৃত্রিমতার চেয়ে জীবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্যই যেন বেশি ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় কখনোই একমাত্রিক নয়। এই ভূখণ্ডে বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, বয়নশৈলী, খাবার, উৎসব, গান, নৃত্য ও জীবনযাপন পদ্ধতি রয়েছে। এই বৈচিত্র্য দেশের সংস্কৃতিকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি ফ্যাশন জগতের জন্যও সৃষ্টি করেছে বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস। বিশেষত ঐতিহ্যবাহী পোশাকের রং, বুনন, নকশা ও পরার ধরনে জনগোষ্ঠীভেদে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কোথাও হাতে বোনা কাপড়ের সূক্ষ্ম কারুকাজ, কোথাও উজ্জ্বল রঙের প্রাধান্য, আবার কোথাও শরীরে লম্বা কাপড় জড়িয়ে পরার কৌশল—প্রতিটি নকশার সাথে জড়িয়ে থাকে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও পরিচয়।
তবে ঐতিহ্য মানেই যে স্থবিরতা, তা নয়। সময়ের পরিবর্তনের সাথে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায়ও এসেছে নানা পরিবর্তন। আধুনিক পোশাক, শহুরে জীবন ও সমকালীন ফ্যাশনের প্রভাব পড়েছে নতুন প্রজন্মের ওপর। একই সাথে নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। ফলে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পাশাপাশি চলছে। রাঙামাটির এই ফটোশুটের মাধ্যমে টুয়েলভ সেই সমকালীন বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। স্থানীয় ফটোগ্রাফার আরিয়ান এন্ডারসনের ক্যামেরায় পাহাড়ের প্রাকৃতিক পটভূমিতে আদিবাসী মডেলদের সমকালীন পোশাকে ধরা পড়েছে ভিন্ন এক আবহ। কাপ্তাই হ্রদের জল, পাহাড়ের সবুজ আর স্থানীয় মানুষের উপস্থিতি পোশাকগুলোকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
ফ্যাশনের সঙ্গে আদিবাসী সংস্কৃতির সম্পর্ক যে শুধু পোশাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। খাবার, ভাষা, লোকগান, উৎসব ও দৈনন্দিন জীবনাচরণেও রয়েছে তাঁদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়। এসব বৈচিত্র্যও হতে পারে ফ্যাশন ডিজাইনের গভীর অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাতে তৈরি কাপড়, বুনন, রং ও নকশা শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়; সমকালীন ফ্যাশনচর্চায় এগুলো নতুন সৃজনশীলতার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
টুয়েলভের হেড অব ডিজাইন মাসিয়াদ জাহান জানান, এবার তাঁরা নিজেদের আউটলেটে সবার জন্য তৈরি পোশাক নিয়েই রাঙামাটিতে এসেছেন। তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাতে তৈরি কাপড়, বুনন, রং ও নকশার অসাধারণ বৈচিত্র্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন কিছু করার ইচ্ছা রয়েছে। তাঁদের ঐতিহ্যের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই এই শিল্প ও নকশাকে দেশের আরও বেশি মানুষের কাছে এবং একসময় বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চান তাঁরা।
এই আয়োজনকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—আদিবাসী সংস্কৃতিকে ফ্যাশনে ব্যবহারের সময় কীভাবে ঐতিহ্য ও স্বকীয়তার প্রতি সম্মান বজায় রাখা যায়? কোনো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নকশাকে কেবল ফ্যাশন ট্রেন্ড হিসেবে ব্যবহার না করে এর পেছনের ইতিহাস, কারিগর ও সাংস্কৃতিক অর্থকে মূল্যায়ন করা জরুরি। সেই সাথে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশ্ব আদিবাসী দিবসের এই ফটোশুটটি তাই নিছক একটি ফ্যাশন প্রদর্শনী নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে নতুন চোখে দেখার একটি সুযোগ। শহরের ব্যস্ত জীবনে আমরা যে পোশাক পরি, যে খাবার খাই কিংবা যে সংস্কৃতিকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ মনে করি, তার বাইরেও বহু মানুষের বহু বছরের জীবন ও ঐতিহ্যের গল্প রয়েছে। রাঙামাটির পাহাড়ে টুয়েলভের ক্যামেরায় সেই গল্পেরই একটি ছোট্ট অংশ ধরা পড়েছে। পোশাকের সাথে মিশেছে পাহাড়, মানুষের সাথে প্রকৃতি, আর সমকালীন ফ্যাশনের সাথে ঐতিহ্য। বাংলাদেশের সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে। সেই বৈচিত্র্যের প্রতিটি ভাষা, প্রতিটি পোশাক, প্রতিটি খাবার, প্রতিটি বুনন ও সংস্কৃতির রয়েছে নিজস্ব গল্প। সেই গল্পের প্রতি সম্মান রেখে ফ্যাশনের ভাষায় সেগুলোকে উপস্থাপন করাই হতে পারে ভবিষ্যতের অর্থবহ ফ্যাশনচর্চার পথ।




