আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাগান কিংবা খেত থেকে নিজে ফল পেড়ে কেনার যে প্রচলন রয়েছে, এবার যুক্তরাষ্ট্রে সেই অভিজ্ঞতাই পেলেন বাংলাদেশি এক ভূতত্ত্ববিদ। স্থানীয় বাগান মালিকদের ভাষায় এ আয়োজনকে বলা হয় ‘ইউ-পিক’ অর্থাৎ ‘নিজে তুলে নেওয়া’। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রিচল্যান্ড অঞ্চলে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বেন্ট চেরি, রেইনিয়ার চেরি, ডোনাট পিচ, হোয়াইট নেকটারিন, রিচ প্রাইড পিচ, ইয়েলো পিচ, সামার অ্যামেলিয়া ইয়েলো নেকটারিন ও প্লাম এক্স এপ্রিকটসহ নানা জাতের ফল সংগ্রহ করা যায়। কোন সপ্তাহে কোন ফল তোলা যাবে, তার একটি তালিকা খামার কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দেন।

গত ১১ জুলাই সকাল দশটায় লেখক তার স্ত্রী নাসরীন, মেয়ে ডা. সাদিয়া ও জামাই ডা. ফাহাদকে নিয়ে রিচল্যান্ডের হারভেস্ট লেনে অবস্থিত ‘রে ফ্রেঞ্চ অর্চাডে’ যান। সেদিন বাগান থেকে তোলার জন্য নির্ধারিত ফল ছিল ডোনাট পিচ। নিয়ম অনুযায়ী, বাগানে ঢুকে পছন্দমতো ফল গাছ থেকে পেড়ে খাওয়া যায়, তবে বাইরে নিয়ে যেতে হলে প্রতি পাউন্ডের জন্য দিতে হয় সোয়া তিন ডলার। কলম্বিয়া মালভূমির পাদদেশে ও উপত্যকায় গড়ে তোলা এসব বাগানটি প্রায় ছয় থেকে পৌনে দুই কোটি বছরের পুরনো আগ্নেয় শিলা ব্যাসাল্টের ওপর তৈরি।

প্রবেশের পর দেখা যায়, হলুদ ফিতার বেষ্টনী দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে কোন গাছগুলোর ফল তোলার উপযুক্ত। ছোট ছোট গাছের গোড়া অবধি থরে থরে ঝুলছে গোলাপি ও লালচে রঙের ডোনাট পিচ। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষজন আনন্দের সঙ্গে ফল তুলছে, খাচ্ছে এবং ব্যাগভরে কিনে নিচ্ছে—মনে হচ্ছে যেন এক আনন্দমেলা।

চ্যাপটা আকৃতির এই ফলটি মূলত একধরনের সাদা পিচ, যার বৈজ্ঞানিক নাম প্রুনাস পারসিকা ভ্যারাইটি প্লাটিকারপা। বোঁটা তুলে ফলটি উবু করে রাখলে দেখতে অবিকল ডোনাটের মতো লাগে বলেই এর এমন নাম। ইউএফও, গ্যালাক্সি, ট্যাঙ্গো, সুইট ব্যাগেল, সওজি সুইরল, পিচ পাই, ফ্ল্যাট ওয়ান্ডারফুল—বিভিন্ন জাতের এমন মজার নামও রয়েছে। সাধারণ গোল পিচের তুলনায় এ ফল বেশি দামি, কারণ এর চাষ কঠিন এবং ব্লাইট রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ফলের খোসা পাতলা ও মখমলের মতো, ভেতরের শাঁস ঘন, রসালো ও অত্যন্ত মিষ্টি। সুপক্ক অবস্থায় ফলটি এতই নরম হয় যে খোসা ছাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। কামড় দিলেই রস বেরিয়ে আসে। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও পিচ ফলটি সমৃদ্ধ; এতে রয়েছে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, কপার, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজের মতো খনিজ এবং ভিটামিন এ, সি, ই ও কে।

শুধু স্বাদেই নয়, ইতিহাসেও কম আকর্ষণীয় নয় এই ফল। প্রাচীনকাল থেকেই চীনে এ ফলের চাষ হয়ে আসছে। ১৮২৮ সালে উইলিয়াম প্রিন্স নামের এক নার্সারি মালিক উত্তর আমেরিকায় এটি নিয়ে আসেন। তবে বিংশ শতকের আশির দশকে রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় ‘স্যাটার্ন’ নামের একটি জাত উদ্ভাবনের পর এবং মিসৌরির স্টার্ক ব্রোস নার্সারি তা বিক্রি শুরু করলে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। বর্তমানে উদ্ভিদ প্রজননের মাধ্যমে আরও অনেক জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।

স্থানীয় পত্রিকা ট্রাই-সিটি হেরাল্ডে গত ৭ জুন প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, প্রায় ৬০ বছর আগে মি. রে ফ্রেঞ্চ সিনিয়র ও মিরিয়াম ফ্রেঞ্চ ১৬০ একর জমিতে ঝোপ-ঝাড় কেটে প্রথম চারা রোপণ করেছিলেন। সম্প্রতি রবিন ফ্রেঞ্চ ও তার স্ত্রী সান্দ্রা ফ্রেঞ্চ অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ফলে আগামী ২০২৬ ও ২০২৭ মৌসুমে সীমিত পরিসরে খামারটি চালু থাকবে, তবে ২০২৮ সালে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরই মধ্যে গাছ থেকে ফল তোলার সেই অভূতপূর্ব আনন্দ ও সদ্য তোলা ডোনাট পিচের রসাস্বাদন উপভোগ করতে লেখক ও তার পরিবার সেখানে আরেকবারও গিয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন।