কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পদার্পণের সময়টি যে কেবল শারীরিক পরিবর্তনের নয়, মানসিক দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল — এমনটাই মনে করেন কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাউফুন নাহার। তিনি বলেন, নিউরোসায়েন্সের ভাষ্য অনুযায়ী এই বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পূর্ণ হয় না; বরং নির্মাণাধীন ভবনের শেষ পর্যায়ের কাজ চলতে থাকে। ভেতরে সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজ যখন সশব্দে চলছে, তখন বাইরেও জীবনের চাহিদা বেড়ে যায় — বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি, ক্যারিয়ার নির্বাচন, পারিবারিক প্রত্যাশা, এমনকি ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা। ফলে এ সময় মানসিক চাপ বা আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়, বরং পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ারই অংশ। এমন পরিস্থিতিতে ভর্তিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রথমত, ভর্তি পরীক্ষাকে স্প্রিন্ট নয়, ম্যারাথন হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। চার থেকে আট মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলা এই প্রস্তুতিতে কয়েক সপ্তাহ অতিরিক্ত পড়ালেখা করে ক্লান্ত হয়ে পড়লে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, ব্যায়াম এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোকে অবহেলা করা চলবে না। ম্যারাথন দৌড়বিদ যেমন শক্তি সঞ্চয় করে, তেমনই শিক্ষার্থীদেরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের শক্তি ব্যবহার করতে হবে।

দ্বিতীয় পরামর্শে তিনি বাস্তবসম্মত রুটিন ও অনলাইন সীমানা নির্ধারণের ওপর জোর দেন। এলোমেলোভাবে সারা দিন বা রাত পড়ার বদলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে এমন অধ্যায়ন সেশন পরিকল্পনা করা জরুরি। নির্দিষ্ট বিরতি, নিয়মিত রিভিশন এবং সপ্তাহে একদিন অগ্রগতি মূল্যায়নের কথা বলেন তিনি। সেই সঙ্গে ঘুমের নিয়ম মেনে চলা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে পরিমিতিবোধ বজায় রাখার পরামর্শ দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা শর্ট ভিডিও সহজেই মনোযোগ নষ্ট করে বলে পড়ার সময় ফোন নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং সীমিত করার পরামর্শ তার।

তৃতীয়ত, অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার ফাঁদ এড়িয়ে চলতে বলেন তিনি। প্রতিটি মানুষের পছন্দ, আগ্রহ, শেখার ধরন আলাদা — তাই কে কত ঘণ্টা পড়ছে বা মক টেস্টে কত নম্বর পেল, তা দিয়ে নিজের মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। নিজের ধারাবাহিক অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, খারাপ দিনে নিজেকে দোষারোপ না করে বোঝা উচিত যে এই মুহূর্তটা সাময়িক। প্রায়ই একটি ভালো ঘুম, সামান্য হাঁটাচলা, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম বা স্বাস্থ্যকর খাবারই মনকে নতুন করে কাজের উপযোগী করে তোলে।

চতুর্থত, কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা বা মানসিক চাপ বেশি মনে হলে শিক্ষক, সিনিয়র, পরিবার কিংবা সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়াকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন তিনি। সবকিছু একা সামলানোর চেষ্টা না করার পরামর্শ দেন।

সবশেষে তিনি সাফল্যের সংজ্ঞা বড় করে দেখার কথা বলেন। একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা বিষয়ই জীবনের একমাত্র পথ নয়। ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ সাবজেক্টের প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে নিজের আগ্রহ, কৌতূহল ও সমাজে অবদান রাখার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে ক্যারিয়ার নির্বাচনের পরামর্শ দেন। নিজের ও অন্যের প্রতি মমতা, শেখার আগ্রহ, সততা এবং মানসিক সুস্থতাই যে সুখী জীবনের ভিত্তি — তা মনে রাখার কথাও বলেন তিনি।