পাখির কলতান ও গাছপালায় ঘেরা পরিবেশ আমাদের মনকে শান্ত করে তোলে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, শহরের কোনো ছোট বন বা পার্কে মাত্র ১০ মিনিট কাটিয়ে পাখির ডাক শুনলেই মানসিক চাপ অনেকাংশে লাঘব হওয়া সম্ভব। এর ফলে মনের অস্থিরতা কেটে গিয়ে তা সতেজ হয়ে ওঠে।
নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. নিলস পিটারসন ও তাঁর সহযোগীরা এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাদের কাজটি 'এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন' নামের একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল বোঝায় যে নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যে পার্ক ও সবুজ এলাকা শুধু প্রাণিকুলের জন্যই নয়, আমাদের নিজস্ব মানসিক সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য।
বিজ্ঞানীদের এই দলটি ১০৬ জন মানুষের ওপর পরীক্ষা চালান। তাঁদের ভিন্ন চারটি পরিবেশ ও শব্দের সম্মুখীন করা হয়। কখনো তাদেরকে শান্ত বনের মধ্যে বসিয়ে হেডফোনের মাধ্যমে পাখির ডাক অথবা গাড়ির তীব্র আওয়াজ শোনানো হয়, আবার কখনো একই অভিজ্ঞতা ব্যস্ত শহরের পরিবেশে বসিয়ে দেওয়া হয়।
পরীক্ষার সমাপ্তিতে দেখা গেল, একইসাথে প্রশান্তিময় সবুজ পরিবেশ ও পাখির সুমধুর গান পাওয়ার মুহূর্তটিই তাঁদের মানসিক প্রশান্তির জন্য সবচেয়ে কার্যকরী ছিল। এতে তাঁদের অস্থিরতা ও মানসিক পরিশ্রম সম্পূর্ণ দূর হয়ে গিয়েছিল। অন্যপক্ষে, শহরের কোলাহলপূর্ণ সড়কে বসে গাড়ির বিরক্তিকর শব্দ শোনার ফল ছিল সবচেয়ে হতাশাজনক।
গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন যে, চারপাশের গাছপালা ও পাখির ডাক আলাদাভাবেও মন ভালো করতে কার্যকর। কিন্তু যখন এই দুইয়ের সংমিশ্রণ পাওয়া যায়, তখন সেটি মানসিক চাপ দূর করতে প্রায় জাদুকরী প্রভাব ফেলে। পূর্ববর্তী কোনো গবেষণাতেই জানা গিয়েছিল যে সবুজ গাছপালা এবং পাখির ডাক উভয়ই আলাদাভাবে মানুষের মেজাজ উন্নত করতে সক্ষম। তবে এই নতুন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে সম্মিলিতভাবে এদের ইতিবাচক প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। শুধু বনে গেলেই মানসিক চাপ কমে না, বরং সেই বনে পাখির গান শোনা গেলে মন অধিক আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিষয়টি দুটি প্রচলিত মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের সাহায্যে সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রকৃতির সংস্পর্শে কিছুটা সময় অতিবাহিত করলে মানুষের মানসিক পরিশ্রম লোপ পায় এবং মনের অস্থিরতা হ্রাস পায়। তারা আরও উল্লেখ করেছেন, প্রকৃতির এই উপকারিতা লাভের অন্যতম সহজ পন্থা হলো পাখির ডাক শ্রবণ করা। এ জন্য কোনো বাড়তি প্রস্তুতির বা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পড়ে না।
উল্লেখযোগ্যভাবে, পরীক্ষায় ব্যবহৃত বনটি কোনো বহু পুরোনো বা বিশালাকার প্রাকৃতিক বন ছিল না। এটি ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মাঝে মানুষের উদ্যোগে নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ-নির্মিত এমন নতুন বন থেকেও পুরোনো বা বড় বনের মতো মানসিক শান্তি পাওয়া যায়।
বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, শহরের খালি জায়গায় নতুন করে বন বা পার্ক গড়ে তোলা কতটা জরুরি। এতে শুধু বুনো প্রাণীক বসবাসের স্থানই হয় না, বরং নাগরিকদের মানসিক চাপ কমাতেও এটি অসাধারণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে শহরগুলো যে হারে বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে প্রকৃতির সংস্পর্শ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তাই শহরের ভেতরেই ছোট ছোট এমন বনায়ন তৈরি করা দরকার, যেখানে পাখিরা বিচরণ করতে পারে। এগুলো দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে আমাদের মনের সতেজতা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।
গবেষক দল তাই পরামর্শ দিচ্ছেন, শুধু বৃক্ষরোপণ করলেই চলবে না, সেই স্থানে পাখির অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতেও নজর দেওয়া জরুরি। বৃক্ষ ও পাখির এই সম্মিলন একদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ করবে, অন্যদিকে মানুষের মনকে শান্ত ও প্রাণবন্ত রাখবে।




