কম-বেশি পরিচিত ও প্রায়ই উপেক্ষিত একটি দেশি ফলের নাম পানিফল। অনেকে আবার আকৃতিগত মিলের কারণে এটিকে শিঙাড়া ফল বলেও ডেকে থাকেন। জলাশয়, পুকুর কিংবা ডোবার জলে ভাসমান লাল বা সবুজ রঙের এই ফলটি দেখতে যেমন সহজলভ্য, তেমনি এর পুষ্টিগুণও বিস্ময়কর। জলে জন্ম বলেই এর এমন নামকরণ। স্বাদ কিছুটা নীরস বা পানসে মনে হলেও স্বাস্থ্যগুণের বিচারে এটি অত্যন্ত মূল্যবান।

এই ফলটির মধ্যে উচ্চ মাত্রায় পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন এবং ভিটামিন এ ও বি-সহ নানাবিধ অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। ত্বক ও চুলের সুস্বাস্থ্যও যেন এর গুণগান করে। সাধারণত এটি কাঁচা অবস্থায়, সালাদ রূপে অথবা সবজি হিসেবে রান্না করেও গ্রহণ করা যেতে পারে। জেনে নিন পানিফলের নয়টি চমৎকার স্বাস্থ্যগত সুবিধা সম্পর্কে।

যেসব ব্যক্তি শরীরের বর্ধিত ওজন কমাতে চাইছেন, তাদের জন্য পানিফল হতে পারে এক আদর্শ সংযোজন। এই ফলের ক্যালরি মান খুবই সীমিত এবং এতে রয়েছে উদার পরিমাণে ফাইবার। ফাইবার দীর্ঘক্ষণ পাকস্থলীতে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে বজায় রাখে। ফলে অস্বাস্থ্যকর নাস্তা বাদ দিয়ে পানিফল খাদ্যতালিকায় স্থান দিলে শরীরে বাড়তি ক্যালরি জমা পড়ে না, অথচ ঘন ঘন খিদেও পায় না, যা ওজন হ্রাসের প্রক্রিয়ায় সহায়ক।

হৃদযন্ত্রের সুস্থতা রক্ষায় পানিফলে বিদ্যমান পটাসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই খনিজটি রক্তে সোডিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদানের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে অবদান রাখে। তদুপরি, এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমূহ শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলা করে এবং হৃদরোগের বিপদ কমায়।

ত্বক ও চুলের পরিচর্যায়ও এই ফলের তুলনা হয় না। ভিটামিন বি ও ভিটামিন ই ত্বককে কোমল ও সুন্দর রাখে; পাশাপাশি ভিটামিন সি ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে তোলে ও কোলাজেন উৎপাদনে উৎসাহ যোগায়। ফলত, ত্বকের বলিরেখা বা বয়সের প্রভাব সহজে পড়ে না এবং তারুণ্যের ভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।

ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্যও পানিফল উপকারী একটি খাদ্য। এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অত্যন্ত কম, যার দরুন রক্তে শর্করার মাত্রা আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পায় না। অধিকন্তু এতে উপস্থিত আঁশ শরীরে শর্করা শোষণের গতি মন্থর করে এবং ইনসুলিনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা দেয়।

রোগ প্রতিরোধ শক্তির উন্নতি সাধনেও পানিফল দারুণ কার্যকর। এতে থাকা ভিটামিন সি দেহের রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে তোলে এবং বিভিন্ন সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ফ্রি র্যা ডিকেলের ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। ঠান্ডা ঋতুতে সাধারণ সর্দি, কাশি ও জ্বর সারাতেও এটি কার্যকর।

যাদের পাচনক্রিয়ায় সমস্যা লেগেই থাকে, তাদের জন্য পানি ফল একটি স্বাভাবিক প্রতিকার হতে পারে। উচ্চমানের ফাইবার খাবার পরিপাক সহজতর করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো ঝামেলা দূর করতে সহায়তা করে।

হাড়ের গঠন মজবুত করতে পানিফলের ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম বেশ উপযোগী; অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকিও এতে কমে। তাছাড়া ভিটামিন ডি ও ফসফরাস হাড়ের নির্মাণ ও পুননির্মাণে ভূমিকা রাখে, যাতে হাড়ের ঘনত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে ও ক্ষয় প্রতিহত হয়।

মানসিক চাপ বা উদ্বেগ কমাতেও এই ফল নজরকাড়া। পানিফলে থাকা ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে এবং সুখ অনুভবের জন্য প্রয়োজনীয় ‘হ্যাপি হরমোন’ নিঃসরণে সহায়তা করে। হতাশা ও স্ট্রেস থেকে মুক্তি পেতে খাবার তালিকায় এই ফলটি যুক্ত করা যেতে পারে।

সবশেষে, কিডনির কার্যক্ষমতা উন্নত করতেও পানিফল সক্ষম। এটি একটি প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক (ডাইইউরেটিক) হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের অতিরিক্ত লবণ ও টক্সিন বহিষ্কার করতে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত এটি সেবন করলে কিডনি সুস্থ থাকে এবং মূত্রনালীর সংক্রমণ রোধ হয়।