ত্বকের বয়স বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করা সম্ভব। কোন অভ্যাসগুলো ত্বককে দীর্ঘদিন সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে সাহায্য করে, আর প্রচলিত কোন ধারণাগুলো নিছক বিপণন কৌশল—এসব নিয়েই ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে অনেকের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যান্টি-এজিং নিয়ে নানা পরামর্শ ছড়িয়ে থাকলেও তার মধ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্যও কম নয়। এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন রূপবিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রয়া মুনতাসীর।
বয়সের ছাপ প্রথমে শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্থানগুলোতে পড়ে। চোখের চারপাশ, ঘাড়, হাতের পিঠ ও মুখমণ্ডল—এসব এলাকার ত্বক তুলনামূলক পাতলা হওয়ায় এবং সূর্যের আলোর সংস্পর্শ বেশি আসায় সেখানে বয়সের ছাপ আগে দেখা দেয়। পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের পরে নারীদের ত্বকে বড় পরিবর্তন আসে। ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় কোলাজেন উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পায়। এর ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, স্থিতিস্থাপকতা কমে, বলিরেখা বেড়ে যায় এবং ক্ষত সারতে বেশি সময় লাগে। অনেকের ত্বক সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে।
পুরুষ ও নারীর অ্যান্টি-এজিং চাহিদায় কিছু ভিন্নতা আছে। পুরুষদের ত্বক তুলনামূলকভাবে মোটা এবং বেশি তেলতেলে হয়; অন্যদিকে নারীদের ত্বকে হরমোনজনিত পরিবর্তন বেশি ঘটে। তবে মৌলিক উপাদান—সানস্ক্রিন, রেটিনয়েড, ভিটামিন সি এবং ময়েশ্চারাইজার—উভয়ের জন্যই সমান প্রয়োজনীয়। বাজারে ‘মেন’ ও ‘উইমেন’ লেখা পণ্যের বেশিরভাগ পার্থক্য মূলত বিপণন কৌশল মাত্র। একই বয়সে সবাইকে সমান তরুণ না দেখানোর পেছনে জিনগত কারণ, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও ত্বকের যত্নের পার্থক্য দায়ী।
অতিরিক্ত স্কিনকেয়ার ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একসঙ্গে অনেক অ্যাকটিভ উপাদান যেমন রেটিনল, এএইচএ, বিএইচএ এবং ভিটামিন সি ব্যবহার করলে ত্বকের প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে জ্বালাপোড়া, লালভাব, শুষ্কতা ও ব্রণ বাড়তে পারে। ‘কমই ভালো’ নীতি অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্য আদর্শ অ্যান্টি-এজিং রুটিন হিসেবে সকালে হালকা ক্লিনজার, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট (ভিটামিন সি), ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। রাতে ক্লিনজার ও রেটিনল বা রেটিনাল ব্যবহারের পর ময়েশ্চারাইজার লাগানো উচিত। শুরুতে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন রেটিনল বা রেটিনাল ব্যবহার করলেই যথেষ্ট। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় জেল বা হালকা লোশনভিত্তিক পণ্য ভালো কাজ করে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, আলাদা আই ক্রিম কি সত্যিই প্রয়োজন? আফরোজা পারভীনের মতে, সব সময় নয়। ভালো একটি ময়েশ্চারাইজারই অনেকের জন্য যথেষ্ট। তবে চোখের চারপাশে কালো দাগ, ফোলাভাব বা সূক্ষ্ম রেখার সমস্যা থাকলে ক্যাফেইন, রেটিনল বা পেপটাইডযুক্ত বিশেষ আই ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম ও ওজনের ওঠানামাও ত্বকের বয়স বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত কম ঘুম কোলাজেন তৈরিতে বাধা দেয়। দ্রুত ওজন কমা বা বারবার ওজন ওঠানামা করলে মুখের ফ্যাট কমে গিয়ে বয়স বেশি মনে হতে পারে।
চিনি ও গ্লাইকেশন প্রক্রিয়া ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত চিনি কোলাজেন ও ইলাস্টিনের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যাডভান্স গ্লাইকেশন অ্যান্ড প্রোডাক্টস তৈরি করে, যা কোলাজেনকে শক্ত ও ভঙ্গুর করে তোলে। ফলে ত্বক দ্রুত বয়সী দেখায়। অ্যান্টি-এজিং চর্চা শুরু করার সঠিক বয়স প্রসঙ্গে তিনি জানান, ৩০ বছর বয়স থেকে শুরু করা উচিত। ২৫ বছর বয়স থেকে সানস্ক্রিন ও মৌলিক উপাদান ব্যবহারের পাশাপাশি ভিটামিন সি এবং রেটিনয়েড যোগ করা যায়। ৪০ বছর বয়সে ভিটামিন সি ও রেটিনয়েডের পাশাপাশি পেপটাইড, ত্বক অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ট্রিটমেন্ট শুরু করা যেতে পারে। ৫০ বছর বয়সে শুষ্কতা নিয়ন্ত্রণ, ব্যারিয়ার রিপেয়ার ও মেনোপজ–পরবর্তী যত্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন উপাদানের কাজ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। রেটিনয়েড ত্বকের কোলাজেন বাড়ায় এবং বলিরেখা কমায়। ভিটামিন সি অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে। নিয়াসিনামাইড ত্বকের ব্যারিয়ার শক্তিশালী করে, দাগ ও প্রদাহ কমায়। পেপটাইড কোলাজেন তৈরি করতে সহায়তা করে এবং হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ত্বকে পানি ধরে রেখে মসৃণ রাখে। রেটিনল ও রেটিনালের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেটিনাল দ্রুত কাজ করে এবং সাধারণত বেশি কার্যকর, তবে সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে পারে। শুরুতে সপ্তাহে দুই বা তিন রাত ব্যবহার করা উচিত এবং সব সময় রাতে ব্যবহার করে দিনে অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে।
কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট নিয়ে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত দুই থেকে ছয় মাস কোলাজেন পেপটাইড খেলে ত্বকের আর্দ্রতা ও স্থিতিস্থাপকতা কিছুটা উন্নত হতে পারে। তবে এটি কোনো জাদুকরি সমাধান নয় এবং সানস্ক্রিন ও ভালো স্কিনকেয়ারের বিকল্পও নয়। বোটক্স, ফিলার, লেজার ও মাইক্রোনিডলিংয়ের মতো চিকিৎসা কারা করাতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, যাদের বয়সজনিত পরিবর্তন বা নির্দিষ্ট সমস্যা রয়েছে, তারাই সাধারণত এসব চিকিৎসা করাতে পারেন। অভিজ্ঞ ডার্মাটোলজিস্ট বা প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে করালে সাধারণত নিরাপদ থাকে, তবে প্রতিটি চিকিৎসার কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব ভিন্ন এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। প্রিভেন্টিভ বোটক্স সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়—শুধু যাদের অভিব্যক্তিজনিত বলিরেখা খুব দ্রুত তৈরি হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অভ্যাস হিসেবে তিনি প্রতিদিন সঠিকভাবে সানস্ক্রিন ব্যবহার, রাতে নিয়মিত রেটিনয়েড ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর জোর দেন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মধ্যে ভালো ঘুম, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসপিএফ ৫০ সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়; এসপিএফ ৩০ সঠিক পরিমাণে ব্যবহার করলে অধিকাংশ মানুষের জন্য যথেষ্ট। তবে যারা দীর্ঘ সময় রোদে থাকেন বা যাদের ত্বক সহজে পুড়ে যায়, তাদের জন্য এসপিএফ ৫০ বেশি উপযোগী। ইউভিএ সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাসায় বা গাড়িতে থাকলেও সানস্ক্রিন প্রয়োজন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি জানালার পাশে দীর্ঘ সময় কাটান বা গাড়ি চালান, তাহলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো। তবে সারা দিন ঘরের ভেতরে জানালা থেকে দূরে থাকলে পুনঃপ্রয়োগের প্রয়োজন না-ও হতে পারে। পারলার ফেশিয়াল ও নিজে বানানো প্যাক বা রেমেডি প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করেন যে, সাধারণ ফেশিয়াল সাময়িকভাবে ত্বক উজ্জ্বল দেখাতে পারে কিন্তু অ্যান্টি-এজিংয়ের স্থায়ী সমাধান নয়। অপরিকল্পিত স্কিন পলিশিং বা লেবু, বেকিং সোডা ও টুথপেস্টের মতো নিজে বানানো উপাদান ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
ত্বকচর্চার নকল পণ্য চেনার উপায় হিসেবে তিনি বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা, সিল, ব্যাচ নম্বর ও মেয়াদ যাচাই করার পরামর্শ দেন। অস্বাভাবিক কম দাম, প্যাকেজিং, বানান বা গন্ধে অস্বাভাবিকতা থাকলে ব্যবহার না করাই ভালো। সীমিত বাজেটে মাত্র তিনটি পণ্য কিনতে হলে ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন (এসপিএফ ৩০), ত্বকের ধরন অনুযায়ী ভালো ময়েশ্চারাইজার এবং রাতে ব্যবহারের জন্য রেটিনয়েড (যদি উপযুক্ত হন) অথবা নতুনদের জন্য ভিটামিন সি সিরামকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।




